প্রকাশিত: মে ২৬, ২০২৬, ০৫:৫৪ পিএম
পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে রাজধানীর উত্তরাঞ্চলকে পরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্যসম্মত ও বাসযোগ্য রাখতে এবার নজিরবিহীন প্রস্তুতি নিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি)। কোরবানির পশুর বর্জ্য দ্রুত অপসারণ, দুর্গন্ধ নিয়ন্ত্রণ, জীবাণুমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিতকরণ এবং নগরবাসীর দুর্ভোগ কমাতে ১৬ হাজার পরিচ্ছন্নতা কর্মী ও সাড়ে ৭ শতাধিক বর্জ্যবাহী যান নিয়ে মাঠে নামছে ডিএনসিসি।
সরকার নির্ধারিত ১২ ঘণ্টার আগেই কোরবানির বর্জ্য অপসারণের দৃঢ় ঘোষণা দিয়েছেন ডিএনসিসি প্রশাসক মোঃ শফিকুল ইসলাম খান। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজধানীর ইতিহাসে এবারই সবচেয়ে সমন্বিত ও প্রযুক্তিনির্ভর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর গুলশানস্থ ডিএনসিসি নগর ভবনে “আসন্ন কোরবানির ঈদে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম” শীর্ষক মতবিনিময় সভায় এ ঘোষণা দেওয়া হয়। সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ডিএনসিসি প্রশাসক।
সভায় জানানো হয়, ঈদের দিন সকাল থেকেই নগরীর প্রতিটি ওয়ার্ডে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম শুরু হবে। কোরবানির বর্জ্য দ্রুত অপসারণের জন্য ট্রাক, ডাম্পার, কন্টেইনার ক্যারিয়ার, পিকআপ ও অন্যান্য ভারী যানবাহন প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এসব বর্জ্য সরাসরি আমিনবাজার ল্যান্ডফিলে নেওয়া হবে।
ডিএনসিসি সূত্রে জানা গেছে, কোরবানির পশুর বর্জ্য দ্রুত অপসারণে প্রতিটি অঞ্চলে আলাদা মনিটরিং টিম, সুপারভাইজার ও কুইক রেসপন্স ইউনিট (কিউআরটি) কাজ করবে। পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষও চালু থাকবে।
১২ ঘণ্টার আগেই পরিচ্ছন্ন নগরী উপহার দেব:
সভায় ডিএনসিসি প্রশাসক মোঃ শফিকুল ইসলাম খান বলেন,
“সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী ১২ ঘণ্টার আগেই কোরবানির বর্জ্য অপসারণে আমরা সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিয়েছি। ইনশাআল্লাহ, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন এলাকার প্রতিটি সড়ক দ্রুত পরিষ্কার করে নগরবাসীকে পরিচ্ছন্ন ও স্বস্তিদায়ক পরিবেশ উপহার দিতে সক্ষম হব।”
তিনি আরও বলেন, বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রমে কোনো ধরনের গাফিলতি বরদাশত করা হবে না। মাঠপর্যায়ে সার্বক্ষণিক তদারকির জন্য কর্মকর্তাদের বিশেষ দায়িত্ব বণ্টন করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় বিশেষ প্রস্তুতি:
প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সারা দেশের কোরবানির পশুর হাট, চামড়া ব্যবস্থাপনা, যানজট নিরসন ও বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম নিয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকের মাধ্যমে বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছেন।
তিনি বলেন,
“সিটি কর্পোরেশনগুলোকে ১২ ঘণ্টার মধ্যে কোরবানির বর্জ্য অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আমি বিশ্বাস করি, ডিএনসিসির যে প্রস্তুতি দেখলাম, তাতে নির্ধারিত সময়েরও অনেক আগেই নগরবাসী একটি পরিচ্ছন্ন নগরী দেখতে পাবে।”
বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা নিরসনে নগরবাসীর সহযোগিতা কামনা করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ড্রেনেজ ব্যবস্থা সচল রাখতে বিশেষ টিম প্রস্তুত রাখা হয়েছে। অতিবৃষ্টি হলে দ্রুত পানি নিষ্কাশনের জন্য কুইক রেসপন্স টিম ও ড্রেনেজ ইউনিট মাঠে কাজ করবে।
প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিং, নতুন সড়ক ও ট্রেঞ্চ নির্মাণ:
আমিনবাজার ল্যান্ডফিলে দ্রুত বর্জ্য খালাস নিশ্চিত করতে নতুন সংযোগ সড়ক, অতিরিক্ত প্ল্যাটফর্ম ও ট্রেঞ্চ নির্মাণ করা হয়েছে। বর্জ্যবাহী যানবাহনের চলাচল ও ট্রিপ তদারকিতে ডিজিটাল ওয়েব্রিজের মাধ্যমে রিয়েল-টাইম মনিটরিং চালু রাখা হয়েছে।
ডিএনসিসি কর্মকর্তারা জানান, এর ফলে কোন গাড়ি কখন বর্জ্য বহন করছে, কতবার ট্রিপ দিচ্ছে এবং কোথায় অবস্থান করছে—সব তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে নিয়ন্ত্রণ কক্ষে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। এতে অপচয় কমবে, কাজের গতি বাড়বে এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে।
১৬ লাখ পলিব্যাগ, ব্লিচিং পাউডার ও জীবাণুনাশক বিতরণ:
কোরবানির বর্জ্য নির্ধারিত স্থানে সংরক্ষণে নগরবাসীর মধ্যে ইতোমধ্যে ১৬ লাখ ৩০ হাজার পলিব্যাগ বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে ও দুর্গন্ধ নিয়ন্ত্রণে ৩৬০০ বস্তা ব্লিচিং পাউডার, ১৩৪৮ ক্যান ফিনাইল এবং ৩৯০০ ক্যান স্যাভলন বিতরণ সম্পন্ন হয়েছে।
ডিএনসিসি বলছে, কোরবানির পর দ্রুত জীবাণুমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রতিটি এলাকায় বিশেষ স্প্রে কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
জনসচেতনতায় ব্যাপক প্রচারণা:
শুধু বর্জ্য অপসারণ নয়, পরিচ্ছন্নতা বিষয়ে নাগরিক সচেতনতা বাড়াতেও ব্যাপক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শহরজুড়ে মাইকিং, ডিজিটাল বিলবোর্ডে প্রচারণা, ৫০ হাজার লিফলেট বিতরণ এবং মোবাইল এসএমএস ক্যাম্পেইন চালানো হচ্ছে।
এছাড়া মসজিদের ইমামদের মাধ্যমে জুমার খুতবায় পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে কোরবানি সম্পন্ন করার আহ্বান জানানো হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নগরবাসী সচেতন না হলে শুধু সিটি কর্পোরেশনের একক প্রচেষ্টায় কাঙ্ক্ষিত পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা কঠিন। তাই নাগরিকদেরও নির্ধারিত স্থানে বর্জ্য ফেলা, পলিব্যাগ ব্যবহার এবং খোলা জায়গায় রক্ত বা বর্জ্য না ছড়ানোর বিষয়ে দায়িত্বশীল হতে হবে।
স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে বিশেষ নজর:
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, কোরবানির পশুর রক্ত ও বর্জ্য দ্রুত অপসারণ না হলে দুর্গন্ধ, জীবাণু বিস্তার, মশা-মাছির উপদ্রব এবং পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে এ ঝুঁকি আরও বেশি থাকে।
সেই বাস্তবতায় ডিএনসিসির এবারের প্রস্তুতিকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন নগর পরিকল্পনাবিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, দ্রুত বর্জ্য অপসারণের পাশাপাশি সঠিকভাবে ডাম্পিং ও জীবাণুমুক্তকরণ কার্যক্রম নিশ্চিত করা গেলে রাজধানীর পরিবেশগত ঝুঁকি অনেকাংশে কমে আসবে।
উপস্থিত ছিলেন যাঁরা:
সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান, প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা কমডোর মোহাম্মদ হুমায়ুন কবীর, প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী, প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ রকিবুল হাসানসহ বিভিন্ন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা, পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাবৃন্দ এবং গণমাধ্যম প্রতিনিধিরা।
ঈদুল আজহার মতো বৃহৎ ধর্মীয় আয়োজনের পর রাজধানীকে দ্রুত স্বাভাবিক ও পরিচ্ছন্ন অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে ডিএনসিসির এ বিশাল কর্মযজ্ঞ এখন নগরবাসীর প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। নগরবাসীর প্রত্যাশা—ঘোষণার মতো বাস্তবেও যদি ১২ ঘণ্টার আগেই বর্জ্যমুক্ত পরিচ্ছন্ন নগরী উপহার দেওয়া যায়, তবে সেটি হবে রাজধানীর পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থাপনায় এক নতুন দৃষ্টান্ত।



