প্রকাশিত: জুন ৩, ২০২৬, ১০:৫৫ এএম
নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে এক গৃহবধূর রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় দেড় বছর পর প্রকাশিত ময়নাতদন্ত রিপোর্টে উঠে এসেছে ভয়াবহ সত্য—এটি কোনো স্বাভাবিক মৃত্যু নয়, বরং শ্বাসরোধ করে হত্যা (গলা টিপে হত্যা)।
নিহত গৃহবধূ জিদনী আক্তার (২৩), যার মৃত্যুকে প্রথমে অসুস্থতা বলে চালানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত চিকিৎসা ও ফরেনসিক (বৈজ্ঞানিক অপরাধ বিশ্লেষণ) বিশ্লেষণে প্রমাণিত হয়েছে, তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।
ঘটনাটির সূত্রপাত: প্রেম, বিয়ে, তারপর নির্যাতন
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আড়াইহাজার উপজেলার শ্রীনিবাসদী গ্রামের বাসিন্দা ও নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ নেতা, সরকারি সফর আলী কলেজের সাবেক জিএস (সাধারণ সম্পাদক) সুমন মিয়ার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কের পর জিদনীর বিয়ে হয়।
বিয়ের পর থেকেই যৌতুকের দাবিতে শুরু হয় নির্যাতন।
পরিবারের দাবি, বিয়ের পর বিভিন্ন সময়ে নগদ টাকা, স্বর্ণালংকার ও মূল্যবান সামগ্রী আদায় করা হলেও নির্যাতন থামেনি।
মৃত্যুর আগের রাত: ভিডিও কলে নির্যাতনের বর্ণনা
মৃত্যুর আগের রাতে জিদনী ভিডিও কলে তার পরিবারের কাছে কান্নাজড়িত কণ্ঠে নির্যাতনের কথা জানান।
পরিবারের অভিযোগ, এই ঘটনার পরই ক্ষুব্ধ হয়ে স্বামী ও তার পরিবারের সদস্যরা তাকে মারধর করে হত্যা করে।
ঘটনার দিন: হাসপাতালে ‘মৃত ঘোষণা’
২৭ নভেম্বর ২০২৪ সকালে জিদনীকে আড়াইহাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এ সময় অভিযুক্ত পক্ষ দাবি করে, “তিনি অসুস্থ হয়ে মারা গেছেন।”
কিন্তু পরিবারের অভিযোগ, এটি ছিল পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড, যা তখনই ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
ময়নাতদন্ত রিপোর্ট: ‘শ্বাসরোধে মৃত্যু’
নারায়ণগঞ্জ ভিক্টোরিয়া হাসপাতালের প্যাথলজি (রোগতত্ত্ব) বিভাগে সম্পন্ন হওয়া ময়নাতদন্ত রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়—
“ময়নাতদন্তের ফলাফল, টিস্যু পরীক্ষা এবং রাসায়নিক বিশ্লেষণ প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আমরা মতামত দিচ্ছি যে, গলায় চাপ প্রয়োগজনিত শ্বাসরোধের কারণে মৃত্যু হয়েছে।”
অর্থাৎ, গলায় চাপ প্রয়োগ করে শ্বাসরোধে মৃত্যু হয়েছে।
এছাড়া রিপোর্টে হৃদপিণ্ড ও মস্তিষ্কে কোনো অস্বাভাবিকতা পাওয়া যায়নি, যা স্বাভাবিক মৃত্যুর দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
অভিযোগে ভয়াবহ বর্ণনা
নিহতের মা বাদী হয়ে দাখিল করা অভিযোগে উল্লেখ করেন—
- বিয়ের পর থেকে ধারাবাহিকভাবে যৌতুকের জন্য নির্যাতন।
- সন্তানের জন্মের পরও নির্যাতন অব্যাহত।
- ঘটনার দিন রাতে মারধর ও গলা চেপে হত্যা।
- পরে আত্মহত্যা বা স্বাভাবিক মৃত্যুর নাটক সাজানোর চেষ্টা।
অভিযোগ: থানার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
২৭ নভেম্বর ২০২৪ হত্যার পরদিন নিহতের মা বাদী হয়ে আড়াইহাজার থানায় একটি হত্যা মামলা দিতে চাইলে তখন হত্যা মামলা না নিয়ে একটি অপমৃত্যুর মামলা নেওয়া হয়।
পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, ঘটনার সময় আড়াইহাজার থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রাথমিকভাবে ঘটনাকে “স্বাভাবিক মৃত্যু” হিসেবে আমলে নেন এবং হত্যা মামলা না নিয়ে একটি অপমৃত্যুর মামলা রুজু করেন। পরে পরিবারের চাপে ও সম্মতিতে লাশ ময়নাতদন্তের জন্য নারায়ণগঞ্জ ভিক্টোরিয়া হাসপাতালে পাঠানো হয়।
প্রশ্ন উঠেছে, ময়নাতদন্ত ছাড়াই কীভাবে একটি হত্যাকে স্বাভাবিক মৃত্যু বলে ঘোষণা করা হয়েছিল?
দেড় বছরের অপেক্ষা, তারপর সত্য প্রকাশ
ময়নাতদন্ত রিপোর্টে স্বাক্ষরের তারিখ ২৯ মার্চ ২০২৬।
বাদীর হাতে রিপোর্ট পৌঁছায় ১ এপ্রিল ২০২৬।
দীর্ঘ ১ বছর ৪ মাস পর এই রিপোর্ট হাতে পেয়ে পরিবার নতুন করে ন্যায়বিচারের আশায় মামলা দায়ের করে।
অবশেষে হত্যা মামলা রুজু ও গ্রেপ্তার
বাদী জিদনীর মা আড়াইহাজার থানায় স্বামী সুমন মিয়া, তার মা-বাবা, তিন বোন, এক বোনের জামাই এবং বড় বোনের ছেলেসহ মোট আটজনের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
তবে—
১. এখন পর্যন্ত শুধু মূল আসামি সুমন মিয়া গ্রেপ্তার হয়েছে।
২. অন্য আসামিরা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে।
পরিবারের অভিযোগ, বাকি আসামিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়িয়ে বাদীকে হুমকি দিচ্ছে।
এ বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা এসআই ফরিদের সঙ্গে এ প্রতিবেদকের কথা হলে তিনি জানান, মামলা রুজুর দিন রাতেই মূল আসামি সুমনকে তার বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যান্য আসামিরা পলাতক রয়েছে। তবে দ্রুত তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান পরিচালনা করা হবে এবং আইনের আওতায় আনা হবে।
নিরাপত্তাহীনতায় বাদী পরিবার
বাদী পক্ষ আশঙ্কা করছে—
- যেকোনো সময় হামলার শিকার হতে পারেন।
- এমনকি প্রাণনাশের ঝুঁকিও রয়েছে।
তারা দ্রুত সব আসামির গ্রেপ্তার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
একটি শিশুর নীরব কান্না
জিদনীর মৃত্যুর সময় তার ছেলে সন্তানের বয়স ছিল মাত্র ১ মাস ২ দিন।
বর্তমানে তার বয়স ১ বছর ৫ মাস।
এই নিষ্পাপ শিশুটি আজ মায়ের স্নেহ থেকে বঞ্চিত—একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের নির্মম শিকার হয়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ময়নাতদন্তে শ্বাসরোধ প্রমাণিত হওয়ায় এটি একটি সরাসরি হত্যা মামলা (দণ্ডবিধি অনুযায়ী)।
তদন্তে গাফিলতি বা প্রভাব থাকলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
দাবি: পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি
স্থানীয় সচেতন মহল ও ভুক্তভোগী পরিবার দাবি জানিয়েছে—
১. সব আসামির দ্রুত গ্রেপ্তার।
২. ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত।
৩. পূর্বে যারা ঘটনাকে ধামাচাপা দিতে চেয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা।
৪. বাদী পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ।
জিদনী আক্তারের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের নয়—এটি আমাদের সমাজের বিচারব্যবস্থা, নারীর নিরাপত্তা এবং মানবিকতার এক কঠিন পরীক্ষা।
দেড় বছর পর সত্য প্রকাশ পেলেও প্রশ্ন রয়ে গেছে—এই বিলম্বের দায় কার? ন্যায়বিচার কত দ্রুত নিশ্চিত হবে?
পূর্বে প্রকাশিত সংবাদ প্রসঙ্গ
ঐ ঘটনার সংবাদটি “যৌতুকের দাবিতে স্ত্রীকে পিটিয়ে হত্যা করল ছাত্রলীগ নেতা” শিরোনামে আরটিভি অনলাইনে ২৭ নভেম্বর ২০২৪ তারিখে প্রকাশিত হয়েছিল।
এছাড়া একই দিনে, ২৭ নভেম্বর ২০২৪, দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার অনলাইন ও প্রিন্ট সংস্করণে শিরোনাম ছিল— “আড়াইহাজারে গৃহবধূকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ”।



