প্রকাশিত: জুন ১০, ২০২৬, ০৯:৫২ এএম
বিসিএসে বয়সসীমা বাড়ানোর সুপারিশ, পরীক্ষার ফি পুনর্নির্ধারণের উদ্যোগ; কর্মবিরতি স্থগিত ইন্টার্ন ও পোস্টগ্র্যাজুয়েট চিকিৎসকদের:দেশের বেসরকারি স্বাস্থ্যখাতে কর্মরত হাজারো নবীন চিকিৎসকের দীর্ঘদিনের বেতন বৈষম্য, অনিশ্চিত কর্মপরিবেশ ও পেশাগত হতাশা নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, মেডিকেল কলেজ ও ডেন্টাল কলেজে কর্মরত এন্ট্রি-লেভেল চিকিৎসকদের জন্য একটি যৌক্তিক, সমন্বিত ও মর্যাদাপূর্ণ বেতন কাঠামো প্রণয়নের লক্ষ্যে সাত সদস্যের উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিসিএস (স্বাস্থ্য) ক্যাডারে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বৃদ্ধির সুপারিশ এবং বিভিন্ন পেশাগত পরীক্ষার ফি পুনর্নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্যখাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বহু নবীন চিকিৎসক অপ্রতুল বেতন, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা এবং সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। অনেক ক্ষেত্রে তাদের পারিশ্রমিক পেশাগত দায়িত্ব, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও কর্মঘণ্টার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে ন্যায্য ও গ্রহণযোগ্য বেতন কাঠামোর দাবি দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসক সমাজের অন্যতম প্রধান আন্দোলনের বিষয় হয়ে উঠেছিল।
সোমবার (৮ জুন) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সভাকক্ষে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে ইন্টার্ন ও পোস্টগ্র্যাজুয়েট চিকিৎসকদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকের পর এসব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
পরদিন মঙ্গলবার স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের চিকিৎসা শিক্ষা-১ শাখা থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে বেতন কাঠামো প্রণয়নের জন্য উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়।
২০ কর্মদিবসের মধ্যে সুপারিশ:
সরকারি আদেশ অনুযায়ী, কমিটির নেতৃত্ব দেবেন স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক। কমিটির সদস্য হিসেবে থাকবেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের বেসরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা শাখার যুগ্মসচিব, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের যুগ্মসচিব, চিকিৎসা শিক্ষা, হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
কমিটিকে দেশের বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজসমূহে নবীন চিকিৎসকদের বর্তমান বেতন, ভাতা, অন্যান্য আর্থিক সুবিধা ও কর্মপরিবেশ পর্যালোচনা করতে বলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের মতামত গ্রহণ করে একটি বাস্তবসম্মত, গ্রহণযোগ্য ও মর্যাদাপূর্ণ বেতন কাঠামোর খসড়া প্রস্তুত করতে হবে।
আগামী ২০ কর্মদিবসের মধ্যে সুপারিশসহ পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের সচিবের কাছে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
চিকিৎসকদের দাবির প্রতিফলন:
চিকিৎসক নেতারা বলছেন, এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি প্রশাসনিক উদ্যোগ নয়; এটি দীর্ঘদিনের আন্দোলন, দাবি এবং পেশাগত মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি।
ইন্টার্ন ও পোস্টগ্র্যাজুয়েট চিকিৎসকদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বেতন কাঠামোর পাশাপাশি পেশাগত নিরাপত্তা, কর্মপরিবেশ, স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইন, ক্যারিয়ার উন্নয়ন এবং প্রশিক্ষণব্যবস্থা নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়।
সভার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সরকারের ইতিবাচক অবস্থান চিকিৎসকদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বিসিএসে বয়সসীমা বৃদ্ধির সুপারিশ:
চিকিৎসকদের আরেকটি দীর্ঘদিনের দাবির বিষয়ে সরকার ইতোমধ্যে আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ নিয়েছে।
স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের প্রশাসন-১ শাখা থেকে জারি করা এক চিঠিতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবকে জানানো হয়েছে যে, ৮ জুন অনুষ্ঠিত সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিসিএস (স্বাস্থ্য) ক্যাডারে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশ করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, চিকিৎসকদের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বয়সসীমা বৃদ্ধির বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়েছে।
চিকিৎসক সমাজের মতে, দীর্ঘ শিক্ষাজীবন, ইন্টার্নশিপ, উচ্চতর প্রশিক্ষণ এবং পেশাগত প্রস্তুতির কারণে অনেক মেধাবী চিকিৎসক বর্তমান বয়সসীমার কারণে বিসিএসে অংশগ্রহণের সুযোগ হারান। বয়সসীমা বৃদ্ধি পেলে এ সমস্যার উল্লেখযোগ্য সমাধান হবে।
পরীক্ষার ফি পুনর্নির্ধারণের উদ্যোগ:
বৈঠকে চিকিৎসকদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি ছিল বিভিন্ন পেশাগত ও উচ্চতর ডিগ্রির পরীক্ষার ফি যৌক্তিক পর্যায়ে পুনর্নির্ধারণ করা।
এ বিষয়ে সরকার বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ানস অ্যান্ড সার্জনস (বিসিপিএস)-কে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের অনুরোধ জানিয়েছে। এতে উচ্চশিক্ষা ও বিশেষজ্ঞ প্রশিক্ষণ গ্রহণে নবীন চিকিৎসকদের আর্থিক চাপ কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কর্মবিরতি স্থগিত:
সরকারের লিখিত আশ্বাস ও গৃহীত সিদ্ধান্তের পর ইন্টার্ন ও পোস্টগ্র্যাজুয়েট চিকিৎসকেরা তাদের চলমান কর্মবিরতি স্থগিত করেছেন।
চিকিৎসক প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, সরকারের সদিচ্ছা ও দ্রুত পদক্ষেপের প্রতি সম্মান জানিয়ে তারা আপাতত কর্মসূচি প্রত্যাহার করেছেন। তবে ঘোষিত সিদ্ধান্তগুলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়িত না হলে ভবিষ্যতে নতুন কর্মসূচির বিষয়ে বিবেচনা করা হবে।
স্বাস্থ্যখাতে নতুন প্রত্যাশা:
স্বাস্থ্যনীতি বিশ্লেষক ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, বেসরকারি খাতের নবীন চিকিৎসকদের জন্য স্বীকৃত ও মানসম্মত বেতন কাঠামো প্রণয়ন করা গেলে তা দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় একটি যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা করবে।
এতে চিকিৎসকদের পেশাগত মর্যাদা ও আর্থিক নিরাপত্তা বৃদ্ধি পাবে, মেধাবী চিকিৎসকদের দেশেই ধরে রাখা সহজ হবে এবং স্বাস্থ্যসেবার সামগ্রিক মান উন্নত হবে। একই সঙ্গে রোগীরা আরও দায়িত্বশীল, দক্ষ ও মানবিক স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, অনিশ্চয়তা ও পেশাগত হতাশার পর সরকারের এই উদ্যোগে আশার আলো দেখছেন দেশের হাজারো নবীন চিকিৎসক। এখন তাদের একটাই প্রত্যাশা—প্রতিশ্রুতি যেন কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থেকে দ্রুত বাস্তবে রূপ নেয় এবং দেশের স্বাস্থ্যখাতে একটি নতুন, ন্যায়ভিত্তিক ও মর্যাদাপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা ঘটে।
এই সংস্করণটি প্রথম পাতার লিড নিউজ হিসেবে প্রকাশযোগ্য করে তৈরি করা হয়েছে, যেখানে সংবাদমূল্য, মানবিক আবেদন, নীতিগত গুরুত্ব এবং জাতীয় প্রভাব—চারটি দিকই সমন্বয় করা হয়েছে।



