রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বাক্-শ্রবণ প্রতিবন্ধী হাওয়াকে জীবনসঙ্গী করলেন টিটু

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬, ০৬:১৯ পিএম

বাক্-শ্রবণ প্রতিবন্ধী হাওয়াকে জীবনসঙ্গী করলেন টিটু

ছবি: সংগৃহীত

শারীরিক সীমাবদ্ধতা ভালোবাসার পথে বাধা হতে পারে না—এমনই এক মানবিক দৃষ্টান্ত তৈরি করেছেন সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার যুবক টিটু মিয়া। বাক্ ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী তরুণী হাওয়া আক্তারকে জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, দাম্পত্য জীবনের জন্য বাহ্যিক সক্ষমতার চেয়ে পারস্পরিক বোঝাপড়া, সম্মতি ও ভালোবাসাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

টিটু মিয়ার বয়স ৩০ বছর। তার স্ত্রী হাওয়া আক্তারের বয়স ২৭। উপজেলার চামরদানী ইউনিয়নের টেপিরকোনা গ্রামের বাসিন্দা টিটু চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দক্ষিণ বংশীকুন্ডা ইউনিয়নের মির্জাপুর গ্রামে তার খালার বাড়িতে বেড়াতে যান। সেখানেই প্রতিবেশী এক পরিবারের মেয়ে হাওয়ার সঙ্গে তার পরিচয় হয়।

প্রথম পরিচয়ের পর ধীরে ধীরে দুজনের মধ্যে যোগাযোগ তৈরি হয়। হাওয়া কথা বলতে ও শুনতে না পারায় প্রচলিত কথোপকথনের সুযোগ ছিল না। তবে ইশারা, চোখের দৃষ্টি ও হাতের ভঙ্গির মাধ্যমে তাদের মধ্যে ভাবের আদান-প্রদান শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে সেই পরিচয় পরিণত হয় ভালো লাগায়। একপর্যায়ে দুজনই একসঙ্গে জীবন কাটানোর সিদ্ধান্ত নেন।

পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করে কোনো ধরনের যৌতুক ছাড়াই হাওয়াকে বিয়ে করেন টিটু। স্থানীয় কাজীর মাধ্যমে তাদের বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়টিও স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনার জন্ম দেয়।

বিয়ের পর হাওয়া তার নতুন জীবনে শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে বাধা হতে দেননি। সংসারের বিভিন্ন কাজে তিনি স্বামীর পাশে থাকার চেষ্টা করছেন। ঘর পরিষ্কার করা, রান্নার প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া, গবাদিপশুর যত্ন নেওয়া এবং পরিবারের দৈনন্দিন কাজে সহযোগিতা করার মতো নানা দায়িত্ব তিনি সামলাচ্ছেন।

তাদের সম্পর্কের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, কথা ও শ্রবণশক্তির সীমাবদ্ধতার মধ্যেও দুজনের পারস্পরিক বোঝাপড়া। হাওয়ার সঙ্গে যোগাযোগের জন্য টিটুও ইশারা ও অঙ্গভঙ্গির আশ্রয় নেন। ফলে স্বাভাবিক কথাবার্তার সুযোগ না থাকলেও দুজন নিজেদের অনুভূতি প্রকাশের নিজস্ব পথ তৈরি করেছেন।

তবে এই দাম্পত্যের পথ পুরোপুরি মসৃণ নয়। টিটুর বাবা ছেলের সিদ্ধান্তকে মেনে নিলেও পরিবারের অন্য কয়েকজন সদস্য এখনো বিষয়টি সহজভাবে গ্রহণ করতে পারেননি। বিশেষ করে হাওয়ার শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে পরিবারের কিছু সদস্যের আপত্তি রয়েছে বলে জানা গেছে। এ কারণে বিয়ের কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও টিটু এখনো স্ত্রীকে নিজের পৈতৃক বাড়িতে নিয়ে যেতে পারেননি।

বর্তমানে হাওয়া তার মায়ের জরাজীর্ণ বাড়িতে স্বামীর সঙ্গে বসবাস করছেন। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেই তারা সংসার চালানোর চেষ্টা করছেন। স্বামী-স্ত্রীর ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিবারটিরও নানা দুশ্চিন্তা রয়েছে। তারপরও টিটুর বাবা ছেলের পছন্দকে সম্মান জানিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছেন।

টিটুর বাবা কাছা মিয়া বলেন, বিয়ে মানুষের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। ছেলে যাকে পছন্দ করেছে, তাকে সম্মান দিয়ে পরিবারের সদস্য হিসেবে গ্রহণ করাই তার দায়িত্ব। পারিবারিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে হাওয়াকে নিজের বাড়িতে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করবেন বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে নতুন এই দম্পতির পাশে দাঁড়াতে সরকারি ও বেসরকারি সহযোগিতার প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও দম্পতিটির পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন। হাওয়া ও তার ভাই বর্তমানে সরকারি প্রতিবন্ধী ভাতা পাচ্ছেন। ভবিষ্যতে তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহযোগিতা দেওয়ার বিষয়েও আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

সুনামগঞ্জের প্রত্যন্ত এলাকার এই দম্পতির গল্প তাই শুধু একটি বিয়ের ঘটনা নয়; এটি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েও নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে। শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে কাউকে ভালোবাসা, সংসার কিংবা স্বাভাবিক জীবন থেকে দূরে রাখা উচিত নয়—টিটু ও হাওয়ার সম্পর্ক সেই বার্তাই তুলে ধরছে। পারিবারিক বাধা ও আর্থিক সংকট পেরিয়ে তারা যেন নিজেদের সংসারকে সুন্দরভাবে এগিয়ে নিতে পারেন, সেই প্রত্যাশা স্থানীয়দের।

মাতৃভূমির খবর

Advertisement
Advertisement
Link copied!