প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৬, ২০২৬, ০৫:২২ পিএম
পরিবারের দারিদ্র্য দূর করার স্বপ্ন নিয়ে প্রায় আড়াই বছর আগে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার শ্রীপ্রতিপুর গ্রামের শুভ কুমার দাস। সংসারের আর্থিক সংকট কাটাতে বাবার দুই শতক জমি বিক্রি করে লেবাননে গিয়েছিলেন ২৮ বছর বয়সী এই তরুণ। সেখানে কাজ করে নিয়মিত পরিবারের কাছে টাকা পাঠালেও শেষ পর্যন্ত স্বপ্ন পূরণ হলো না তাঁর। যুদ্ধের ভয়াবহতায় ড্রোন হামলায় প্রাণ হারিয়ে তিন মাস ২৬ দিন পর রোববার নিজ বাড়িতে ফিরেছে তাঁর মরদেহ।
৬ সেপ্টেম্বর সকাল ১০টার দিকে শুভর মরদেহ বাড়িতে পৌঁছালে স্বজনদের মধ্যে নেমে আসে শোকের ছায়া। প্রিয় সন্তানকে জীবিত অবস্থায় ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় থাকা বাবা-মাকে শেষ পর্যন্ত গ্রহণ করতে হলো সন্তানের নিথর দেহ। ছোট একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করা পরিবারটিতে এখন কান্নার মাতম। শোকে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন স্বজনেরা।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, শুভর পরিবারের আর্থিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত নাজুক। তাঁর বাবা শুভরঞ্জন দাস ভ্যান চালিয়ে সংসার চালান। পরিবারের এই সংকট কিছুটা দূর করার আশায় নিজের সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন শুভ। কিন্তু বিদেশে যাওয়ার প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড় করতে বাবার দুই শতক জমি বিক্রি করতে হয়।
প্রায় আড়াই বছর আগে লেবাননে যাওয়ার পর একটি বাড়ি ও তার পাশের ফলের বাগান দেখাশোনার কাজ নেন শুভ। কঠোর পরিশ্রম করে আয় করা অর্থের একটি অংশ নিয়মিত দেশে পাঠাতেন তিনি। তাঁর আশা ছিল, কিছুদিন পর পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো হবে। বাবা-মায়ের কষ্ট কমবে এবং সংসারে ফিরবে স্বচ্ছলতা।
কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি। গত ১১ মে লেবাননের মাইফাদুন এলাকায় ড্রোন হামলায় নিহত হন শুভ। আকস্মিক এই মৃত্যুর সংবাদে পরিবারে নেমে আসে গভীর শোক। এরপর দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর অবশেষে রোববার তাঁর মরদেহ দেশে এনে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
শুভর স্বজনেরা জানান, বিদেশে যাওয়ার পরও তিনি পরিবারের কথা সবসময় ভাবতেন। নিজের কষ্টের উপার্জন থেকে দেশে অর্থ পাঠাতেন। ভবিষ্যতে দেশে ফিরে বাবা-মায়ের পাশে দাঁড়ানোর ইচ্ছা ছিল তাঁর। পরিবারের অভাব কিছুটা কাটিয়ে ওঠার পর স্থায়ীভাবে দেশে ফেরার স্বপ্নও দেখতেন তিনি। সেই স্বপ্নের পরিবর্তে এখন তাঁর মরদেহ ফিরেছে কফিনে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, শুভ খুব সাধারণ পরিবারের সন্তান ছিলেন। পরিবারের আর্থিক সংকট দূর করার জন্যই বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন। নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার পাশাপাশি বাবা-মায়ের জীবনেও স্বস্তি ফেরানোর চেষ্টা ছিল তাঁর। কিন্তু যুদ্ধের নির্মম বাস্তবতা কেড়ে নিল পরিবারের একমাত্র আশার মানুষটিকে।
শুভর বাবা এখনো ভ্যান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। ছেলের মৃত্যুর পর পরিবারটি আরও বড় আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। স্বজনেরা বলছেন, যে জমি বিক্রি করে শুভ বিদেশে গিয়েছিলেন, সেই জমি আর নেই; ছেলেটিও নেই। ফলে পরিবারটির সামনে এখন ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শুভর পরিবারের আর্থিক দুরবস্থার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। সরকারি সহায়তার পাশাপাশি পরিবারের কোনো সদস্যের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যায় কি না, সে বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এদিকে প্রবাসীকল্যাণ-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে শুভর পরিবারের কাছে ৮৫ হাজার টাকার একটি চেক হস্তান্তর করা হয়েছে। সরকারি উদ্যোগে চলতি মাসের শেষে পরিবারটিকে আরও তিন লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কথা রয়েছে। পাশাপাশি জীবনবিমার আওতায় পরিবারটি আরও ১০ লাখ টাকা পাওয়ার কথা রয়েছে।
তবে অর্থনৈতিক সহায়তা পেলেও প্রিয় মানুষ হারানোর শোক কোনোভাবেই পূরণ হওয়ার নয়। পরিবারের সদস্যদের কাছে শুভ ছিলেন শুধু উপার্জনক্ষম একজন ব্যক্তি নন, ছিলেন ভবিষ্যতের স্বপ্ন ও আশার প্রতীক। তাঁর উপার্জনের ওপর পরিবারের অনেক প্রত্যাশা নির্ভর করছিল। সেই মানুষটিই এখন চিরদিনের জন্য ফিরে এসেছেন নিথর দেহ হয়ে।
শুভর মরদেহ বাড়িতে পৌঁছানোর পর পুরো এলাকায় নেমে আসে শোকের পরিবেশ। স্বজন ও প্রতিবেশীদের চোখে-মুখে ছিল বেদনার ছাপ। যে তরুণটি পরিবারের অভাব দূর করার প্রত্যাশায় দূরদেশে গিয়েছিলেন, তাঁর এমন করুণ পরিণতি কেউ মেনে নিতে পারছেন না।
শুভর সৎকারের সময় এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে পরিবারের এই কঠিন সময়ে সরকারি সহায়তা দ্রুত পৌঁছে দেওয়া এবং তাঁদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। তাঁদের প্রত্যাশা, শুভর পরিবার যেন একমাত্র উপার্জনক্ষম সন্তানকে হারিয়ে চরম অসহায়ত্বের মধ্যে না পড়ে।
বিদেশে গিয়ে পরিবারের ভাগ্য বদলের স্বপ্ন দেখেছিলেন শুভ। সেই স্বপ্ন হয়তো তাঁর জীবদ্দশায় পূরণ হয়নি। কিন্তু তাঁর পরিবারের জন্য যে ত্যাগ তিনি করে গেছেন, বাবার জমি বিক্রি করে বিদেশে পাড়ি জমানোর সেই সিদ্ধান্ত এবং শেষ পর্যন্ত দেশের মাটিতে নিথর হয়ে ফিরে আসার ঘটনা এখন সাতক্ষীরার এই পরিবারটির জন্য এক বেদনাবিধুর স্মৃতি হয়ে রইল।



