রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

জর্দার কৌটায় নষ্ট ১০ বছরের সঞ্চয়, শেষ সম্বল হারিয়ে নিঃস্ব বিধবা

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৭, ২০২৬, ০৯:২৪ এএম

জর্দার কৌটায় নষ্ট ১০ বছরের সঞ্চয়, শেষ সম্বল হারিয়ে নিঃস্ব বিধবা

ছবিঃ সংগৃহীত

দীর্ঘ ১০ বছর ধরে অল্প অল্প করে জমানো দুই লাখ টাকা। স্বামী-স্ত্রীর কঠোর পরিশ্রমে গড়ে ওঠা সেই সঞ্চয়ই ছিল ভবিষ্যতের একমাত্র ভরসা। সংসারের খরচ মিটিয়ে কখনো সামান্য, কখনো কিছুটা বেশি—এভাবেই বছরের পর বছর টাকা জমিয়েছিলেন শেরপুরের নালিতাবাড়ীর মনোয়ারা বেগম ও তাঁর স্বামী জিয়া উদ্দীন। কিন্তু নিরাপদ ভেবে জর্দার একটি কৌটায় রাখা সেই সঞ্চয় এখন আর ব্যবহার করার মতো নেই। কৌটার ভেতর দীর্ঘদিন পড়ে থেকে টাকাগুলো নষ্ট হয়ে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে।

স্বামী মারা যাওয়ার মাত্র তিন মাসের মাথায় এমন বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন মনোয়ারা। জীবিকার পথও আগের মতো নেই। ফলে স্বামীর মৃত্যুর পর যে সামান্য সঞ্চয়টুকু তাঁকে কঠিন সময়ে ভরসা দেওয়ার কথা ছিল, সেটিও হারিয়ে যাওয়ায় চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন তিনি।

মনোয়ারা বেগম নালিতাবাড়ী পৌরশহরের পুরাতন জেলখানা সড়কসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে ভোগাই নদী থেকে বালু ও পাথর সংগ্রহ করে বিক্রি করতেন তিনি। তাঁর স্বামী জিয়া উদ্দীন ছিলেন মিষ্টি তৈরির কারিগর। দুজনের আয়েই কোনোভাবে চলত সংসার। সেই আয়ের মধ্য থেকেই দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন তাঁরা।

সংসারের প্রয়োজন মেটানোর পর ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে স্বামী-স্ত্রী মিলে প্রায় এক দশক ধরে অল্প অল্প করে টাকা জমাতে থাকেন। খুচরা টাকা জমিয়ে পরে এক হাজার টাকার নোট সংগ্রহ করতেন। এভাবে ধীরে ধীরে তাঁদের সঞ্চয়ের পরিমাণ বাড়তে থাকে। প্রায় আট মাস আগে সেই সঞ্চয় দুই লাখ টাকায় পৌঁছায়।

জমানো টাকা কোথায় রাখবেন, তা নিয়ে আলাদা কোনো ব্যবস্থা না থাকায় একটি জর্দার কৌটাকেই নিরাপদ মনে করেছিলেন মনোয়ারা। সেখানেই রেখে দেন দীর্ঘদিনের কষ্টার্জিত সঞ্চয়। কিন্তু তখন কে জানত, সেই কৌটাই একদিন তাঁর স্বপ্নভঙ্গের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

প্রায় তিন মাস আগে মারা যান জিয়া উদ্দীন। স্বামীর মৃত্যুর পর সংসারের দায়িত্ব অনেকটাই একা সামলাতে হচ্ছে মনোয়ারাকে। এর মধ্যে জীবিকার জন্য যে নদীর ওপর নির্ভর করতেন, সেখানেও আগের মতো পাথর পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে আয়-রোজগারের পথ সংকুচিত হয়ে পড়ে।

সম্প্রতি প্রয়োজনের কারণে জমানো টাকা ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেন মনোয়ারা। কিন্তু জর্দার কৌটার মুখ খুলতে গিয়ে বিপাকে পড়েন তিনি। কোনোভাবেই কৌটার ঢাকনা খোলা যাচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে কৌটার মুখ কেটে ভেতরের টাকা বের করেন।

কৌটা খোলার পর যা দেখেন, তাতে হতবাক হয়ে যান তিনি। ভেতরে থাকা দীর্ঘদিনের সঞ্চয়ের নোটগুলো ঝাঁঝরা হয়ে গেছে। অনেক নোট ভেঙে ছোট ছোট টুকরায় পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ ১০ বছরের কষ্টে জমানো দুই লাখ টাকার সঞ্চয় কার্যত আর ব্যবহারযোগ্য নেই।

রোববার নিজের বাড়িতে বসে সেই ঘটনার কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন মনোয়ারা বেগম। তিনি জানান, স্বামীর মৃত্যুর পর ওই টাকাই ছিল তাঁর শেষ সম্বল। মেয়েদের বিয়ে দিতে গিয়ে জীবনের বড় একটি সময় কষ্টের মধ্য দিয়ে কাটিয়েছেন। ভবিষ্যতে অসুস্থতা, সংসারের প্রয়োজন কিংবা অন্য কোনো বিপদে ওই টাকা কাজে লাগবে—এমন আশা ছিল তাঁর।

মনোয়ারা বেগম বলেন, স্বামী মারা যাওয়ার পর তাঁর আর তেমন কোনো আয়ের পথ নেই। নদী থেকেও আগের মতো পাথর পাওয়া যায় না। এর মধ্যে বহু বছরের সঞ্চয় নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তিনি এখন কীভাবে চলবেন, সেটিই তাঁর বড় চিন্তা।

স্থানীয় বাসিন্দারাও মনোয়ারার এই দুর্দশায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের ভাষ্য, মনোয়ারা ও তাঁর স্বামী দুজনই দীর্ঘদিন অত্যন্ত কষ্ট করে সংসার চালিয়েছেন। নিজেদের প্রয়োজন কমিয়ে ভবিষ্যতের জন্য যে অর্থ তাঁরা জমিয়েছিলেন, সেটিই এখন নষ্ট হয়ে গেছে।

প্রতিবেশীরা বলছেন, স্বামীর মৃত্যুর পর মনোয়ারার জীবনে একের পর এক সংকট নেমে এসেছে। জীবিকার অনিশ্চয়তা, সংসারের দায়িত্ব এবং দীর্ঘদিনের সঞ্চয় হারানোর ঘটনা তাঁকে আরও অসহায় করে তুলেছে।

দুই লাখ টাকা হয়তো অনেকের কাছে শুধু একটি অর্থের অঙ্ক। কিন্তু মনোয়ারা বেগমের কাছে এই অর্থের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল প্রায় এক দশকের পরিশ্রম, স্বামীকে হারানোর পর বেঁচে থাকার আশা এবং ভবিষ্যতের নিরাপত্তা। সেই সঞ্চয় নষ্ট হয়ে যাওয়ায় এখন তাঁর সামনে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।

মাতৃভূমির খবর

Advertisement
Advertisement
Link copied!