প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৬, ২০২৬, ০৫:০৭ পিএম
বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন কিছু তারকা আছেন, যাঁদের পর্দা থেকে বিদায় নেওয়ার পরও জনপ্রিয়তা কমেনি; বরং সময়ের সঙ্গে তাঁদের প্রতি দর্শকের ভালোবাসা আরও গভীর হয়েছে। সালমান শাহ তাঁদেরই একজন। মৃত্যুর তিন দশক পেরিয়ে গেলেও তাঁর অভিনয়, ব্যক্তিত্ব, পোশাকের ধরন ও পর্দার উপস্থিতি এখনো নতুন-পুরোনো প্রজন্মের দর্শকের কাছে সমান আকর্ষণীয়।
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মাত্র ২৪ বছর বয়সে আকস্মিক মৃত্যু হয় সালমান শাহর। সেদিন তাঁর চলে যাওয়ার খবর বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অঙ্গন ও অসংখ্য ভক্তকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। দেখতে দেখতে তাঁর মৃত্যুর ৩০ বছর পূর্ণ হলো। কিন্তু দীর্ঘ এই সময়েও ঢাকাই চলচ্চিত্রে তাঁর অবস্থান এতটুকু ম্লান হয়নি। বরং প্রতি বছর তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী এলে নতুন করে আলোচনায় ফিরে আসে তাঁর কর্মজীবন, অভিনয় এবং অকালপ্রয়াণের নানা স্মৃতি।
শাহরিয়ার চৌধুরী ইমন নামের এই অভিনেতা খুব অল্প সময়েই দর্শকের কাছে ‘সালমান শাহ’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন। নব্বইয়ের দশকে তাঁর অভিনয়ের ধরন ছিল সমসাময়িক অন্যদের তুলনায় আলাদা। পর্দায় স্বাভাবিক অভিব্যক্তি, পোশাকের নতুনত্ব, চুলের সাজ, কথা বলার ভঙ্গি এবং আধুনিক ব্যক্তিত্ব তরুণ দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল।
১৯৭১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সিলেটে জন্ম নেওয়া সালমান শাহ ছোটবেলা থেকেই সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রতি আগ্রহী ছিলেন। গান ও মডেলিংয়ের মাধ্যমে বিনোদন জগতে তাঁর পথচলা শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে অভিনয়ে এসে তিনি খুব দ্রুত নিজের জন্য আলাদা জায়গা তৈরি করে নেন।
বড় পর্দায় তাঁর অভিষেক ঘটে ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। প্রথম চলচ্চিত্রেই দর্শকের ব্যাপক সাড়া পাওয়ার পর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। একের পর এক জনপ্রিয় চলচ্চিত্রে অভিনয় করে অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি হয়ে ওঠেন নব্বইয়ের দশকের অন্যতম জনপ্রিয় নায়ক।
মাত্র কয়েক বছরের চলচ্চিত্রজীবনে তিনি ২৭টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। এর মধ্যে ‘তুমি আমার’, ‘অন্তরে অন্তরে’, ‘সুজন সখী’, ‘স্বপ্নের ঠিকানা’, ‘সত্যের মৃত্যু নেই’, ‘আনন্দ অশ্রু’, ‘তোমাকে চাই’সহ বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র দর্শকের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। তাঁর অভিনীত অনেক চলচ্চিত্র এখনো দর্শকের স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে আছে।
সালমান শাহর বিশেষত্ব ছিল শুধু অভিনয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর পোশাক ও সাজসজ্জা সে সময়ের তরুণদের মধ্যে নতুন ধরনের ফ্যাশনচর্চার প্রভাব তৈরি করেছিল। পর্দায় তিনি যে ধরনের পোশাক পরতেন কিংবা চুলের যে ধরনের সাজ রাখতেন, তা অনুসরণ করতেন অসংখ্য তরুণ। ফলে তিনি একই সঙ্গে চলচ্চিত্রের নায়ক ও তরুণ প্রজন্মের অন্যতম অনুসরণীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হন।
তাঁর অভিনীত চলচ্চিত্রে বিভিন্ন নায়িকার সঙ্গে জুটি দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। বিশেষ করে প্রেম ও আবেগনির্ভর গল্পে তাঁর অভিনয় দর্শকদের কাছে আলাদা আবেদন তৈরি করে। তাঁর সহজাত অভিনয়শৈলী এবং পর্দায় প্রাণবন্ত উপস্থিতি চলচ্চিত্রের গল্পকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলত।
তবে তাঁর জনপ্রিয়তার পাশাপাশি মৃত্যুর ঘটনাও দীর্ঘদিন ধরে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ইস্কাটনের বাসা থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। শুরু থেকেই তাঁর মৃত্যু নিয়ে নানা আলোচনা ও সন্দেহ তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে বিষয়টি নিয়ে তদন্ত, আইনি প্রক্রিয়া ও বিভিন্ন বক্তব্য সামনে এসেছে। তিন দশক পেরিয়ে গেলেও তাঁর মৃত্যুকে ঘিরে মানুষের আগ্রহ পুরোপুরি শেষ হয়নি।
সালমান শাহর পরিবারও দীর্ঘদিন ধরে তাঁর মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন তুলে আসছে। সময়ের সঙ্গে এ বিষয়ে নতুন করে নানা আলোচনা সামনে এসেছে। ফলে তাঁর অভিনয়জীবনের পাশাপাশি মৃত্যুর ঘটনাটিও বাংলাদেশের মানুষের কাছে একটি আলোচিত অধ্যায় হয়ে আছে।
তবে সব আলোচনা ছাপিয়ে আজও সবচেয়ে শক্তিশালী হয়ে আছে তাঁর শিল্পীসত্তা। মৃত্যুর পরও তাঁর চলচ্চিত্র নিয়মিত দর্শকের আগ্রহ তৈরি করে। তাঁর অভিনীত চরিত্র, সংলাপ, গান ও চলচ্চিত্রের বিভিন্ন দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন প্রজন্মের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। প্রতি বছর ৬ সেপ্টেম্বর এলেই ভক্তরা নানা আয়োজনে প্রিয় নায়ককে স্মরণ করেন।
তিন দশক আগে যে তরুণ অভিনেতা মাত্র ২৪ বছর বয়সে পৃথিবী ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন, তাঁর জনপ্রিয়তা আজও একইভাবে টিকে আছে—এটাই সালমান শাহর সবচেয়ে বড় সাফল্য। অল্প সময়ের কর্মজীবনে তিনি যে ছাপ রেখে গেছেন, দীর্ঘ সময় পেরিয়েও তা মুছে যায়নি।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের বহু তারকা সময়ের সঙ্গে দর্শকের স্মৃতি থেকে হারিয়ে গেলেও সালমান শাহ যেন ব্যতিক্রম। তাঁর সিনেমা, অভিনয়, ব্যক্তিত্ব এবং ফ্যাশন এখনো আলোচনায় আসে। নতুন প্রজন্মের অনেক দর্শকও তাঁর পুরোনো চলচ্চিত্র দেখে মুগ্ধ হন। এভাবেই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ছে তাঁর জনপ্রিয়তা।
সালমান শাহ আজ শারীরিকভাবে নেই, কিন্তু তাঁর অভিনয়ের স্মৃতি এখনো বেঁচে আছে দর্শকের মনে। ঢাকাই চলচ্চিত্রে তাঁর অকালপ্রয়াণ যে শূন্যতা তৈরি করেছিল, তা কখনো পূরণ হয়নি। বরং তিন দশক পরও তাঁর নাম উচ্চারিত হয় ভালোবাসা, আবেগ ও শ্রদ্ধার সঙ্গে। সময়ের স্রোত তাঁকে দূরে সরিয়ে নিতে পারেনি; বরং কিংবদন্তি হিসেবে তাঁর অবস্থান আরও দৃঢ় করেছে।



