প্রকাশিত: জুলাই ১১, ২০২৬, ১০:২৮ এএম
রাশিয়ার ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা মোকাবিলায় ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে নতুন পদক্ষেপ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইউক্রেনকে নিজ দেশে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরির অনুমতি দেওয়া হবে। এর মাধ্যমে ইউক্রেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত সহায়তা নিয়ে নিজস্ব প্রতিরক্ষা উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ পাবে।
তুরস্কে অনুষ্ঠিত ন্যাটো সম্মেলনের ফাঁকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠকে ট্রাম্প এই সিদ্ধান্তের কথা জানান। তিনি বলেন, ইউক্রেনকে প্যাট্রিয়ট তৈরির অধিকার দেওয়া হবে এবং এই প্রযুক্তি ব্যবহারের পদ্ধতিও তাদের জানানো হবে। তবে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের মজুত থাকা প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ইউক্রেনকে সরবরাহ করবে না বলেও স্পষ্ট করেছেন তিনি।
বর্তমানে রুশ হামলা ঠেকাতে ইউক্রেনের অন্যতম প্রধান নির্ভরতা হচ্ছে প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। কিন্তু এসব প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ায় মজুত দ্রুত কমে আসছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে নিজেদের প্রয়োজন মেটাতে দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা তৈরির দিকে এগোতে চাইছে কিয়েভ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বল্প সময়ে এই উদ্যোগের বড় সুবিধা পাওয়া কঠিন হতে পারে। কারণ প্যাট্রিয়ট শুধু একটি ক্ষেপণাস্ত্র নয়, এর সঙ্গে রয়েছে উন্নত রাডার ব্যবস্থা, মোবাইল উৎক্ষেপণ কেন্দ্র এবং নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি। পুরো ব্যবস্থাটি তৈরি ও পরিচালনার জন্য দীর্ঘ প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামো প্রয়োজন।
তবে প্রযুক্তি হস্তান্তরের সুযোগ পেলে ইউক্রেন ভবিষ্যতে নিজস্ব আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা উন্নত করতে পারবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। একই সঙ্গে তুলনামূলক কম জটিল ও কম খরচের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি তৈরির পথও সহজ হতে পারে।
এদিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধরন দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। বর্তমানে প্রচলিত সেনা অভিযানের পাশাপাশি ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে ছোট আকারের ড্রোন ব্যবহার করে শত্রুপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করা এবং নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার ঘটনা নিয়মিত ঘটছে।
ইউক্রেন এখন নজরদারি ও হামলাকারী ড্রোনের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করছে। দেশটির সেনারা একসঙ্গে একাধিক ড্রোনের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে যুদ্ধক্ষেত্রের তথ্য সংগ্রহ করছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতের যুদ্ধ আরও বেশি তথ্য ও প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠবে, যেখানে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
যুদ্ধক্ষেত্রে শুধু আকাশপথেই নয়, স্থলভাগেও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। ইউক্রেনে বিভিন্ন ধরনের স্থলভিত্তিক রোবট ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব রোবট সরবরাহ পৌঁছে দেওয়া, আহত সেনাদের উদ্ধার, প্রতিরক্ষা অবস্থান শক্তিশালী করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অভিযান চালানোর কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।
প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধের এই পরিবর্তনের পেছনে অন্যতম কারণ হচ্ছে জনবল সংকট। দীর্ঘ সময় ধরে চলা যুদ্ধে দুই পক্ষই সেনা ও সরঞ্জামের চাপের মুখে রয়েছে। ফলে মানবজীবনের ঝুঁকি কমাতে আধুনিক প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।
তবে সামরিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, শুধু ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে কোনো পক্ষই চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করতে পারবে না। কারণ এসব অস্ত্রের ব্যবহার ব্যয়বহুল এবং প্রতিপক্ষও একই ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করে পাল্টা জবাব দিতে সক্ষম।
সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়া ইউক্রেনের বিভিন্ন শহর ও অবকাঠামো লক্ষ্য করে বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় বহু মানুষ হতাহত হয়েছেন এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর জবাবে ইউক্রেনও রাশিয়ার বিভিন্ন সামরিক ও জ্বালানি স্থাপনায় পাল্টা আঘাত চালাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করবে আকাশ প্রতিরক্ষা, ড্রোন প্রযুক্তি এবং সামরিক উৎপাদন সক্ষমতার ওপর। তবে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিক আলোচনাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ইউক্রেনের পক্ষ থেকে যুদ্ধবিরতির ওপর জোর দেওয়া হলেও রাশিয়া এখনো নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসেনি। যুক্তরাষ্ট্রও ধীরে ধীরে সংঘাত কমিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের দিকে এগোতে চাইছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।



