প্রকাশিত: আগস্ট ২৭, ২০২৬, ০২:০১ পিএম
হিমালয়সংলগ্ন পার্বত্য এলাকায় হিমবাহ ধসে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় নেপাল ও তিব্বতে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। প্রবল পানির স্রোত, কাদা ও ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে মৃতের সংখ্যা ১৬৫ ছাড়িয়েছে। একই সঙ্গে এখনো দেড় হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানা গেছে। নিখোঁজদের সন্ধানে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় ব্যাপক উদ্ধার অভিযান চালানো হচ্ছে।
আকস্মিক এই দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী কয়েকটি এলাকা। মুহূর্তের মধ্যে পাহাড়ি নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়ে জনবসতি, বাজার ও গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্লাবিত হয়। প্রবল স্রোতে বহু যানবাহন ভেসে যাওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও কোথাও কয়েক মিটার পুরু কাদা ও পলির স্তর জমে যাওয়ায় উদ্ধারকাজও কঠিন হয়ে পড়েছে।
রাসুয়া এলাকার প্রধান শুল্ক কর্মকর্তা রাজেন্দ্র ঢুঙ্গানার বর্ণনায় উঠে এসেছে দুর্যোগের ভয়াবহ চিত্র। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, হঠাৎ মাটি কেঁপে ওঠার মতো শব্দের পর পাহাড়ের দিক থেকে প্রচণ্ড গতিতে পানির বিশাল ঢেউ নেমে আসে। সঙ্গে ছিল ধোঁয়ার মতো ঘন মেঘ ও ধুলাবালির স্তর। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তিমুরে বাজারের বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে চলে যায়। সেখানে থাকা তিন শতাধিক যানবাহনও প্রবল স্রোতে ভেসে যায়।
জীবন বাঁচাতে স্থানীয় অনেক মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে জঙ্গল ও অপেক্ষাকৃত উঁচু পাহাড়ি এলাকায় আশ্রয় নেন। কিন্তু সবাই নিরাপদে সরে যাওয়ার সুযোগ পাননি। আকস্মিক স্রোতের কারণে অনেক পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। স্বজনদের খোঁজে দুর্গত এলাকায় এখনো অপেক্ষা করছেন বহু মানুষ।
ত্রিশূলি বাজারের এক ব্যবসায়ীর হৃদয়বিদারক অভিজ্ঞতা এই দুর্যোগের ভয়াবহতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। তিনি জানান, তিব্বত অংশে বাঁধ ভেঙে যাওয়ার খবর পেয়ে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই প্রবল পানির স্রোত তাঁর স্ত্রী ও ১৮ বছর বয়সী সন্তানকে চোখের সামনে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। তাদের উদ্ধারের কোনো সুযোগই পাননি তিনি।
স্থানীয়দের জন্য আরও বিস্ময়কর বিষয় ছিল, দুর্যোগের সময় সংশ্লিষ্ট এলাকায় উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত ছিল না। হিমবাহ ধসে লেন্দে নদীতে বিপুল পরিমাণ পানি আটকে যাওয়ার পর হঠাৎ সেই পানি ভয়াবহ গতিতে নেমে আসে বলে স্থানীয়ভাবে জানানো হয়েছে। পানির সঙ্গে বিপুল পরিমাণ কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ ছুটে আসায় কয়েকটি এলাকা দ্রুত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল জানিয়েছেন, নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তত ৩০০ জন ভারতীয় নাগরিক রয়েছেন। তাঁদের বড় একটি অংশ কৈলাস-মানসসরোবরগামী তীর্থযাত্রী বলে জানা গেছে। সীমান্তবর্তী এলাকায় বিপুলসংখ্যক বিদেশি নাগরিক আটকা পড়ায় বিভিন্ন দেশের পক্ষ থেকেও পরিস্থিতির ওপর নজর রাখা হচ্ছে।
তিব্বতের জিরং কাউন্টিতেও ব্যাপক প্রাণহানি ও নিখোঁজের ঘটনা ঘটেছে। সেখানে বিদেশি নাগরিকসহ কয়েক শতাধিক মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের তথ্য থেকে জানা গেছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে কেউ জীবিত অবস্থায় আটকে আছেন কি না, তা জানতে উদ্ধারকারীরা ঝুঁকি নিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
দুর্যোগের পর ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও শুরু হয়েছে। ভারত জরুরি ত্রাণ হিসেবে ১০ টন প্রয়োজনীয় সামগ্রী পাঠিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র পাঁচ লাখ ডলার সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় পরামর্শক পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে। আন্তর্জাতিক রেড ক্রসও জরুরি সহায়তার জন্য ১৪ লাখ ডলার দেওয়ার কথা জানিয়েছে। পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পক্ষ থেকেও সহযোগিতার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
উদ্ধারকাজে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি, কাদায় ঢাকা রাস্তা এবং বিচ্ছিন্ন যোগাযোগব্যবস্থা। তারপরও নিখোঁজ ব্যক্তিদের উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে সম্ভাব্য জীবিতদের সন্ধানের পাশাপাশি দুর্গতদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
ভয়াবহ এই দুর্যোগে বহু পরিবার এক মুহূর্তে স্বজন হারিয়েছে। কারও ঘরবাড়ি বিলীন হয়েছে, আবার কেউ এখনো প্রিয়জনের ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন। উদ্ধারকাজ যত এগোচ্ছে, ততই প্রকাশ পাচ্ছে পাহাড়ি ঢলের ভয়াবহতার নতুন নতুন চিত্র।



