প্রকাশিত: আগস্ট ২৯, ২০২৬, ০৮:৫৪ এএম
হিমালয়ের দুর্গম উপত্যকাগুলোতে আকস্মিক বন্যার ভয়াবহ আঘাতের দুই দিন পরও স্বাভাবিক হয়নি নেপালের পরিস্থিতি। কয়েক মিনিটের প্রবল স্রোত বহু এলাকা তছনছ করে দেওয়ার পর এখন নিখোঁজ স্বজনদের খুঁজতে হাসপাতাল, পুলিশ কার্যালয় ও সেনা প্রশিক্ষণকেন্দ্রের সামনে ভিড় করছেন অসংখ্য মানুষ। কারও হাতে নিখোঁজ স্বজনের ছবি, কারও কাছে পরিচয় ও শারীরিক বর্ণনা। উদ্ধার হওয়া মানুষের তালিকায় প্রিয়জনের নাম আছে কি না, সেই আশায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন তাঁরা।
স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই নুওয়াকোটের মাইথালিতে নেপালি সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণকেন্দ্রে নিখোঁজ মানুষের স্বজনদের ভিড় বাড়তে থাকে। দুর্গম বিভিন্ন এলাকা থেকে উদ্ধার করে যাদের সেখানে আনা হচ্ছে, তাদের তালিকায় পরিচিত কারও নাম পাওয়া যায় কি না, তা দেখতেই সেখানে ছুটে আসছেন পরিবারের সদস্যরা।
নিখোঁজদের মধ্যে রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা, শ্রমিক, চালক, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য, পর্যটক এবং তীর্থযাত্রী। কেউ গিয়েছিলেন ধর্মীয় স্থানে, কেউ কর্মস্থলে, আবার কেউ জীবিকার প্রয়োজনে দুর্গম সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থান করছিলেন। আকস্মিক বন্যার পর তাঁদের অনেকের সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।
জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত শ্রমিকদের পরিবারগুলোর উদ্বেগও সবচেয়ে বেশি। ত্রিশূলী ও ভোতকোশী নদীর পানি হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় বিভিন্ন স্থাপনা ও কর্মস্থলে থাকা অনেক মানুষ আটকা পড়েন। তাঁদের কেউ নিরাপদে বের হতে পেরেছেন, আবার অনেকের এখনো কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
শশীকলা খাতিওয়াদা নামের এক নারী তাঁর স্বামী দীপক রিমালকে খুঁজছেন। দীপক মাইলুংয়ের একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কাজ করছিলেন। বন্যার দিন বিকেলে তিনি একটি বার্তা পাঠিয়ে জানিয়েছিলেন, তিনি ও তাঁর কয়েকজন সহকর্মী তখনো নিরাপদে আছেন। তবে টানেলের বাইরে বের হতে তাঁদের সহায়তা প্রয়োজন। এরপর থেকে তাঁর সঙ্গে আর যোগাযোগ করতে পারেননি শশীকলা। স্বামীর কোনো খবর পাওয়া যায় কি না, সেই আশায় নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে ছুটে বেড়াচ্ছেন তিনি।
একইভাবে স্বামী সোম বাহাদুর ঘার্লেওর সন্ধানে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরছেন বিসিলা তামাং। পেশায় চালক সোম বাহাদুর চীন থেকে আমদানি করা বৈদ্যুতিক গাড়ি আনতে রসুওয়া শুল্ক কার্যালয়ের দিকে গিয়েছিলেন। তিমুরেতে রাত কাটানোর পর তাঁর সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। স্বামীর পরিচয় ও শারীরিক বর্ণনা দিয়ে প্রশিক্ষণকেন্দ্রের সামনে অপেক্ষা করছেন বিসিলা। দুই দিন পেরিয়ে গেলেও কোনো খবর না পাওয়ায় তাঁর উৎকণ্ঠা আরও বেড়েছে।
শুধু সেনা প্রশিক্ষণকেন্দ্র নয়, কাঠমান্ডুর হাসপাতালগুলোতেও একই চিত্র দেখা গেছে। মহারাজগঞ্জের ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষণ হাসপাতালে বন্যার পর আহত ও উদ্ধার হওয়া মানুষদের দেখতে স্বজনদের ভিড় জমেছে। সেখানে পুলিশের সহায়তা কেন্দ্র স্থাপন করে হাসপাতালে আনা ব্যক্তিদের একটি তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে।
নতুন করে কোনো অ্যাম্বুলেন্স হাসপাতালে এসে পৌঁছালেই স্বজনরা ছুটে যাচ্ছেন তার দিকে। ভেতর থেকে বের করে আনা ব্যক্তিদের মধ্যে পরিচিত মুখ খুঁজছেন তাঁরা। কাউকে নিজের মানুষ মনে হলে ছুটে যাচ্ছেন কাছে, আর পরিচিত কাউকে না পেলে হতাশ হয়ে আবার অপেক্ষার জায়গায় ফিরে আসছেন। এভাবে একের পর এক অ্যাম্বুলেন্সের দিকে তাকিয়ে সময় পার করছেন অনেকে।
কেউ আবার একটি হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটে বেড়াচ্ছেন। আহতদের তালিকায় স্বজনের নাম আছে কি না দেখছেন, পুলিশের কাছে নিখোঁজ ব্যক্তির ছবি ও পরিচয় দিচ্ছেন। দোলখার বিজুলা কার্কিও এমন একজন মা, যিনি তাঁর ২৪ বছর বয়সী ছেলেকে খুঁজে বেড়াচ্ছেন। বন্যার দিন সকালে ছেলে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় জানিয়েছিলেন, কিছু কেনাকাটা করে দ্রুত ফিরে আসবেন। মায়ের সঙ্গে সেটিই ছিল তাঁর শেষ কথা। এরপর থেকে ছেলের আর কোনো সন্ধান পাননি বিজুলা।
এদিকে দুর্গম এলাকাগুলোতে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। বন্যাকবলিত নদী ও উপত্যকার বিস্তীর্ণ এলাকায় নেপালি সেনাবাহিনী, পুলিশ এবং সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা অভিযান চালাচ্ছেন। হেলিকপ্টার ব্যবহার করে দুর্গম অঞ্চলগুলোতে আটকে পড়া মানুষদের শনাক্ত ও উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।
নেপালি সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তিমুরে, সিয়াবরবেসি ও মাইলুংয়ের মতো দুর্গম এলাকা থেকে ইতোমধ্যে শত শত মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে। তবে দুর্গম ভূপ্রকৃতি, যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং বন্যার বিস্তৃতির কারণে উদ্ধারকাজে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, দেশি-বিদেশি পর্যটকসহ এখনো বহু মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। ফলে উদ্ধার অভিযানের পাশাপাশি নিখোঁজদের পরিচয় শনাক্ত এবং তাঁদের পরিবারের কাছে তথ্য পৌঁছে দেওয়ার কাজও সমান গুরুত্ব পাচ্ছে।
বন্যার পানি অনেকটা কমে এলেও স্বজনদের উৎকণ্ঠা কমেনি। সেনা ক্যাম্প, হাসপাতাল ও নিরাপত্তা বাহিনীর বিভিন্ন স্থাপনার সামনে এখনো মানুষের ভিড়। প্রত্যেকেই অপেক্ষা করছেন একটি খবরের জন্য—প্রিয় মানুষটি জীবিত আছেন কি না। কারও কাছে প্রতিটি তালিকা নতুন আশার সম্ভাবনা, আবার কারও কাছে নতুন করে হতাশ হওয়ার আশঙ্কা।
প্রকৃতির আকস্মিক আঘাতে কয়েক মিনিটেই বদলে যাওয়া নেপালের এই পরিস্থিতিতে উদ্ধারকর্মীরা প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে গেলেও স্বজনদের কাছে সময় যেন থমকে আছে। একটি পরিচিত নাম, একটি ফোনকল কিংবা অ্যাম্বুলেন্স থেকে নেমে আসা পরিচিত মুখ—এই সামান্য আশাতেই দিন গুনছেন নিখোঁজদের পরিবারের সদস্যরা।



