রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বন্যার স্রোতে হারিয়ে গিয়েও মায়ের কোলে ৮ বছরের জোয়াল

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: আগস্ট ২৯, ২০২৬, ০৩:১১ পিএম

বন্যার স্রোতে হারিয়ে গিয়েও মায়ের কোলে ৮ বছরের জোয়াল

ছবি: সংগৃহীত

নেপালের ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে চারদিকে যখন ধ্বংসযজ্ঞ, তখন প্রাণ বাঁচাতে জঙ্গলের দিকে ছুটেছিল আট বছরের শিশু জোয়াল ঘালে। সঙ্গে ছিল তার এক বন্ধু। মুহূর্তের মধ্যেই চারপাশ পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় জীবন বাঁচাতে একটি গাছে উঠে আশ্রয় নেয় জোয়াল। এরপর সেই গাছেই কেটে যায় তার একটি রাত। এদিকে সন্তান কোথায়, আদৌ বেঁচে আছে কি না—কিছুই জানতে পারছিলেন না তার মা মতি মায়া তামাং।

সন্তানদের খুঁজতে এক আশ্রয়কেন্দ্র থেকে অন্য আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটে বেড়িয়েছেন তিনি। কোথাও তাদের সন্ধান না পেয়ে একপর্যায়ে ধরে নিয়েছিলেন, ভয়াবহ বন্যার স্রোতে হয়তো দুই সন্তানকেই হারিয়েছেন। কিন্তু কয়েক দিন পর হঠাৎ আসে স্বস্তির খবর। জীবিত অবস্থায় উদ্ধার হয়েছে জোয়াল।

বন্যায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত নেপালের রাসুয়া জেলার একটি দুর্গম এলাকা থেকে বৃহস্পতিবার আকাশপথে জোয়ালকে উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারের সময় তার একটি পা ভাঙা ছিল। মুখ ও শরীরেও ছিল আঘাতের চিহ্ন। পরে তাকে নুয়াকোট জেলার একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরিবারের সন্ধান পাওয়ার চেষ্টা চলছিল।

জোয়ালকে শনাক্ত করার জন্য তার উদ্ধার ও হাসপাতালের অবস্থার একটি ভিডিও ধারণ করা হয়। সেই ভিডিও দেখেই তার মা সন্তানের সন্ধান পান। হাসপাতালের একজন সংবাদকর্মীর দেওয়া যোগাযোগ নম্বরে ফোন করে জোয়ালের মা জানতে পারেন, তার সন্তান জীবিত আছে এবং তাকে রাজধানীর একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।

খবরটি শুনে বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না মতি মায়া। দীর্ঘ অপেক্ষা ও উৎকণ্ঠার পর শুক্রবার তিনি রাজধানীতে পৌঁছে হাসপাতালে ছেলের সঙ্গে দেখা করেন। সন্তানের পাশে দাঁড়ানোর সেই মুহূর্তে তার চোখে-মুখে ফিরে আসে স্বস্তি। তিনি জানান, বড় ছেলেকে জীবিত ফিরে পাওয়ার অনুভূতি তার কাছে যেন নতুন করে জীবন ফিরে পাওয়ার মতো।

বন্যার দিন সকালে প্রতিদিনের মতো জোয়াল ও তার ভাই বিদ্যালয়ের উদ্দেশে বের হয়েছিল। কিছুক্ষণ পর হঠাৎ ভয়াবহ শব্দে কেঁপে ওঠে চারপাশ। লাংটাং লিরুং পর্বতশৃঙ্গের কাছে হিমবাহের একটি অংশ ভেঙে উপত্যকার দিকে নেমে আসে। এর সঙ্গে বরফ, পাথর, পানি ও কাদার বিশাল স্রোত তৈরি হয়ে শুরু হয় ব্যাপক ভূমিধস।

সন্তানদের খোঁজে ছুটে গিয়ে মতি মায়া দেখেন, পরিচিত এলাকাটি মুহূর্তেই বদলে গেছে। সড়ক, বাজার ও বিভিন্ন স্থাপনার অস্তিত্ব বোঝার উপায় ছিল না। চারদিকে শুধু পানি, পাথর ও কাদা। একের পর এক ঘরবাড়ি স্রোতে ভেসে যেতে দেখে তিনি সন্তানদের নিয়েও ভয়াবহ আশঙ্কায় পড়েন।

অন্যদিকে বিদ্যালয়ের দিকে পানি ধেয়ে এলে জোয়াল ও তার বন্ধু দৌড়ে জঙ্গলের দিকে চলে যায়। অন্ধকারের মধ্যে জীবন বাঁচাতে একটি গাছে উঠে পড়ে সে। পরে উদ্ধারকারীরা সেখান থেকেই তাকে খুঁজে বের করেন।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায়ও জোয়ালের হাতে ছিল নেপালের ১০ রুপির দুটি নোট। উদ্ধারকারীরা তাকে হাসপাতালে যেতে রাজি করাতে ওই টাকা দিয়েছিলেন বলে জানা গেছে। ভয়াবহ ঘটনার স্মৃতি মনে করেও শিশুটি সাহস হারায়নি।

তবে এই ভয়াবহ দুর্যোগে নেপাল ও তিব্বত অঞ্চলে ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বহু মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। দুর্গত এলাকাগুলোতে শিশুদের একটি বড় অংশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন শিশুদের খুঁজে বের করে স্বজনদের কাছে ফিরিয়ে দিতে উদ্ধারকারী ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো কাজ করছে।

ধ্বংস, মৃত্যু আর নিখোঁজের দীর্ঘ তালিকার মধ্যেও জোয়ালের ফিরে আসার গল্পটি যেন এক ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে। এক রাত গাছের ডালে কাটিয়ে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা এই শিশুটি শেষ পর্যন্ত ফিরে পেয়েছে তার মাকে। আর সন্তান হারানোর আশঙ্কায় ভেঙে পড়া মতি মায়ার ঘরেও ফিরে এসেছে স্বস্তি।

ছেলের কথা বলতে গিয়ে মায়ের মুখে আবারও ফুটে উঠেছে হাসি। তিনি জানান, জোয়াল বরাবরই দুষ্টু স্বভাবের। নানা দুষ্টুমির কারণে আগেও ছোটখাটো দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে সে। তবে এবারের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি তাকে আগে কখনো হতে হয়নি।

মাতৃভূমির খবর

Advertisement
Advertisement
Link copied!