রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

নেপালের বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৭৯৭, নিখোঁজ ৩০০০

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: আগস্ট ৩১, ২০২৬, ০৯:১১ এএম

নেপালের বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৭৯৭, নিখোঁজ ৩০০০

ছবি: সংগৃহীত

হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ হিমবাহ ধসের পর নেপাল ও চীনে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৭৯৭ জনে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে দুই দেশে এখনো ৩ হাজার ৪৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, নদী ও ধ্বংসস্তূপে আটকে থাকা মানুষদের উদ্ধারে অভিযান আরও জোরদার করা হয়েছে। তবে প্রতিকূল আবহাওয়া, ভারী বৃষ্টি, নদীর পানি বৃদ্ধি এবং বিপুল পরিমাণ কাদা ও ধ্বংসাবশেষের কারণে উদ্ধারকারীদের কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

বুধবার হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ ধসে পড়ার পর বরফ, পাথর, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের বিশাল স্রোত পাহাড়ি উপত্যকা ও নদীপথ দিয়ে দ্রুত নিচের দিকে নেমে আসে। এতে নেপাল ও চীনের সীমান্তবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। বহু ঘরবাড়ি, সড়ক, স্থাপনা ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুর্যোগের প্রভাবে বিপুলসংখ্যক মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশটিতে এখন পর্যন্ত ৭৮১ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন ২ হাজার ৫০২ জন। অন্যদিকে চীনের গিরং এলাকায় ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং নিখোঁজ রয়েছেন আরও ৫৪৬ জন। এ ছাড়া তিব্বত অঞ্চলে ২৩টি দেশের ২৬১ জন বিদেশি নাগরিকের কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না বলে চীনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

দুর্যোগের পর থেকেই দুই দেশের বিভিন্ন দুর্গম এলাকায় উদ্ধার অভিযান শুরু হয়েছে। রবিবারও নেপাল ও চীনের উদ্ধারকারী দল ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকায় অভিযান চালিয়েছে। কিন্তু নতুন করে বৃষ্টি শুরু হওয়ায় অনেক স্থানে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। নেপালের ত্রিশূলী নদীর পানি বাড়তে থাকায় স্থানীয় বাসিন্দা ও উদ্ধারকারীদের নিরাপদ উঁচু এলাকায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এতে ওই অঞ্চলে নতুন করে বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

দুর্যোগের পর নেপাল-চীন সীমান্ত এলাকায় একটি হ্রদের সৃষ্টি হওয়ায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে। হ্রদের পানি উপচে নেপালের লেন্দে খোলা ও ত্রিশূলী নদীতে প্রবেশ করলে ভাটির বিস্তীর্ণ এলাকায় বন্যা দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। যদিও হ্রদের বড় অংশের পানি ইতোমধ্যে বের হয়ে গেছে, শনিবার রাতে প্রায় ২ দশমিক ৮ কিলোমিটার ভাটিতে একটি নতুন ভূমিধসের সন্ধান পাওয়া যায়। ভূমিধসের ফলে সেখানে প্রাকৃতিক বাঁধ তৈরি হওয়ায় আবারও পানি জমার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

নেপালে ক্ষতিগ্রস্ত পাঁচটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পকে কেন্দ্র করে উদ্ধার অভিযান বিশেষভাবে জোরদার করা হয়েছে। এর মধ্যে আপার ত্রিশূলী প্রকল্পও রয়েছে। একটি সুড়ঙ্গে প্রায় ৩৫০ জন আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তাদের উদ্ধারে নেপালের সেনাবাহিনী ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে দুর্গম এলাকায় পৌঁছেছে। সুড়ঙ্গের প্রবেশপথে জমে থাকা কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ সরানোর কাজ চলছে।

উদ্ধারকারীরা প্রথমে সুড়ঙ্গের প্রবেশপথ নিরাপদ করার চেষ্টা করছেন। এরপর সেখানে অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা করে বিশেষ যন্ত্র ও ক্যামেরার সহায়তায় ভেতরে প্রবেশের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে সুড়ঙ্গের সামনে বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ জমে থাকায় উদ্ধারকাজ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিস্ফোরক ব্যবহার করেও দ্রুত পথ পরিষ্কার করা সম্ভব হচ্ছে না।

নেপালে প্রায় ১০ হাজার সেনা উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে নিয়োজিত রয়েছেন। তাদের সঙ্গে চীন ও ভারতের বিশেষজ্ঞ উদ্ধারকারী দলও কাজ করছে। অন্যদিকে চীন দুর্গম এলাকায় দুই হাজারের বেশি উদ্ধারকর্মী মোতায়েন করেছে। আকাশপথে উদ্ধার সরঞ্জাম ও ত্রাণসামগ্রী পাঠানোর পাশাপাশি নিখোঁজ ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে বিশেষ যন্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে।

দুর্যোগের ভয়াবহতায় উদ্ধারকাজের পাশাপাশি মরদেহ শনাক্ত করাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক মরদেহ এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। কোথাও পুরো মরদেহের পরিবর্তে শুধু শরীরের বিভিন্ন অংশ উদ্ধার করা হয়েছে। নিখোঁজ স্বজনদের খুঁজতে পরিবারের সদস্যরা হাসপাতাল, মর্গ ও ত্রাণকেন্দ্রে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।

দ্রুত পচনশীল মরদেহ থেকে জনস্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হওয়ায় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি—এমন মরদেহগুলো গণকবর দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে নেপাল কর্তৃপক্ষ। ভবিষ্যতে স্বজনদের পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য মরদেহ থেকে বংশগত নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং কোথায় কোন মরদেহ দাফন করা হয়েছে, তার তথ্যও সংরক্ষণ করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক উষ্ণতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব হিমবাহের স্থিতিশীলতাকে দুর্বল করে দিতে পারে। ফলে হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ, বরফ ও পাহাড়ঘেরা জলাধার থেকে সৃষ্ট আকস্মিক দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে। এবারের ঘটনায় অল্প সময়ের মধ্যে কাদা, বরফ ও পাথরের বিশাল স্রোত নেমে আসার বিষয়টিও সেই ঝুঁকির ভয়াবহতা তুলে ধরেছে।

নেপাল ও চীনের সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকাগুলোতে এখনো উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তবে ভারী বৃষ্টি, নদীর পানি বৃদ্ধি, নতুন ভূমিধস এবং আবারও ধ্বংসাবশেষের স্রোত নামার আশঙ্কায় উদ্ধারকারীদের অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে কাজ করতে হচ্ছে। পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত দুর্গত এলাকাগুলোতে নতুন করে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

মাতৃভূমির খবর

Advertisement
Advertisement
Link copied!