রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বিড়ালের কান্না ভেবে খোঁজ, ধ্বংসস্তূপে মিলল ৬ বছরের মণীষা

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: আগস্ট ৩১, ২০২৬, ১১:৪৯ এএম

বিড়ালের কান্না ভেবে খোঁজ, ধ্বংসস্তূপে মিলল ৬ বছরের মণীষা

ছবি: সংগৃহীত

নেপালের ভয়াবহ হড়পা বান ও বন্যায় চারদিকে যখন ধ্বংসের চিহ্ন, তখন ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে ছয় বছরের এক শিশুকে জীবিত উদ্ধারের ঘটনা নতুন আশার সৃষ্টি করেছে। প্রায় ৬০ ঘণ্টা ধরে মাটি, কাদা ও ভাঙা স্থাপনার নিচে আটকে থাকার পর উদ্ধার করা হয়েছে মণীষা মাগার নামের শিশুটিকে।

শুক্রবার সন্ধ্যায় নেপালের টিমুরে গ্রামে এই বিস্ময়কর উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করেন সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা। কয়েক দিন ধরে ওই এলাকায় নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে অভিযান চলছিল। চারদিকে ভেঙে পড়া বাড়িঘর, উপড়ে পড়া গাছ, পাথর, কাদা ও বিভিন্ন ধরনের ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে থাকায় উদ্ধারকারীদের কাজ অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছিল।

উদ্ধারকারীরা টানা তিন দিন ধরে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে নিখোঁজদের খুঁজছিলেন। দীর্ঘ সময় ধরে কোনো জীবিত ব্যক্তির সন্ধান না পাওয়ায় তাদের মধ্যেও হতাশা তৈরি হয়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে হঠাৎ মাটির নিচ থেকে ক্ষীণ কান্নার শব্দ শুনতে পান তারা।

প্রথমে শব্দটির উৎস নিয়ে নিশ্চিত ছিলেন না উদ্ধারকারীরা। কেউ কেউ ধারণা করেছিলেন, হয়তো কোনো প্রাণী ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে রয়েছে। কিন্তু শব্দটি বারবার শোনা যাওয়ায় তারা সেটিকে গুরুত্ব দিয়ে অনুসন্ধান শুরু করেন।

এরপর উদ্ধারকারীরা দ্রুত শব্দের উৎস শনাক্ত করার চেষ্টা করেন। ধীরে ধীরে মাটি, কাদা ও ধ্বংসাবশেষ সরাতে থাকেন তারা। একপর্যায়ে ধ্বংসস্তূপের নিচে শিশুটির মুখ দেখতে পান। এরপর সতর্কতার সঙ্গে তাকে সেখান থেকে বের করে আনা হয়।

প্রায় ৬০ ঘণ্টা মাটি ও কাদার নিচে আটকে থাকার পর মণীষাকে জীবিত অবস্থায় পাওয়া উদ্ধারকারীদের জন্য ছিল অত্যন্ত আবেগঘন মুহূর্ত। শিশুটিকে উদ্ধারের পর দ্রুত তার প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। দীর্ঘ সময় আটকে থাকার কারণে তার শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণে রাখা হয়।

উদ্ধারের পর মণীষাকে রাজধানী কাঠমান্ডুতে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে শুক্রবার রাতেই তাকে সেখানে নেওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে তাকে উদ্ধারকারী দলের শিবিরে রাখা হয়। সেখানে তাকে খাবার ও প্রয়োজনীয় পরিচর্যা দেওয়া হয়।

পরদিন শনিবার আবহাওয়া কিছুটা অনুকূলে এলে হেলিকপ্টারে করে মণীষাকে কাঠমান্ডুতে নেওয়া হয়। পরে তাকে একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। বর্তমানে সেখানে তার চিকিৎসা চলছে এবং চিকিৎসকেরা তার শারীরিক অবস্থার ওপর নজর রাখছেন।

তবে শিশুটিকে জীবিত উদ্ধার করা গেলেও তার পরিবারের সদস্যদের বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। মণীষার বাবা-মা কিংবা পরিবারের অন্য সদস্যরা কোথায় রয়েছেন, তা জানা সম্ভব হয়নি। ফলে একদিকে শিশুটির চিকিৎসা চলছে, অন্যদিকে তার স্বজনদের খুঁজে বের করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

মণীষার পরিচয় ও পরিবারের সন্ধানে জনসাধারণের সহযোগিতাও চাওয়া হয়েছে। শিশুটিকে শনাক্ত করতে এবং তার পরিবারের সদস্যদের খুঁজে পেতে বিভিন্ন মাধ্যমে তথ্য প্রচার করা হচ্ছে।

এদিকে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে মণীষাকে উদ্ধারের দৃশ্যের ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। এতে দেখা যায়, উদ্ধারকারীরা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে মাটি ও ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে শিশুটিকে বের করে আনছেন। ভয়াবহ দুর্যোগের মধ্যে একটি শিশুকে জীবিত উদ্ধারের দৃশ্য অনেকের মধ্যেই আবেগ তৈরি করেছে। উদ্ধারকারীদের সাহস, ধৈর্য ও নিরলস প্রচেষ্টারও প্রশংসা করছেন অনেকে।

নেপালে হড়পা বান ও বন্যার ভয়াবহতায় বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, কাদার স্তূপ, নদীর পানি বৃদ্ধি ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে উদ্ধারকাজ এখনো কঠিন হয়ে আছে। অনেক এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

দুর্যোগের পর বিভিন্ন স্থানে বিপুলসংখ্যক মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় সেগুলো সংরক্ষণ ও শনাক্ত করাও কর্তৃপক্ষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক মরদেহ শনাক্ত করা কঠিন হওয়ায় স্বজনদের পরিচয় নিশ্চিত করতে নমুনা সংগ্রহসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে।

এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেই মণীষা মাগারকে জীবিত উদ্ধারের ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। প্রায় আড়াই দিন ধরে মাটির নিচে আটকে থেকেও তার বেঁচে থাকা শুধু উদ্ধারকারীদের জন্য নয়, দুর্যোগে স্বজন হারানো মানুষের কাছেও আশার বার্তা হয়ে এসেছে।

মণীষার উদ্ধারের ঘটনা আরও একবার দেখিয়ে দিয়েছে, ভয়াবহ দুর্যোগের পরও ধ্বংসস্তূপের নিচে জীবনের সম্ভাবনা থাকতে পারে। সেই সম্ভাবনাকে সামনে রেখেই নেপালে উদ্ধারকারীরা এখনো নিখোঁজদের সন্ধানে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন।

মাতৃভূমির খবর

Advertisement
Advertisement
Link copied!