প্রকাশিত: আগস্ট ৩১, ২০২৬, ০৭:০০ পিএম
ভেনেজুয়েলার জ্বালানি খাত পুনর্গঠন ও তেল উৎপাদন বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা নতুন জ্বালানি চুক্তির মেয়াদ ২৫ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। এই দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগের আওতায় দেশটির তেল উৎপাদন দৈনিক দেড় কোটি ব্যারেলেরও বেশি পর্যায়ে নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ।
শনিবার (২৯ আগস্ট) দেওয়া এক বক্তব্যে রদ্রিগেজ চুক্তিটিকে ভেনেজুয়েলার অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘমেয়াদি এই সমঝোতার মাধ্যমে দেশটির তেলশিল্পে নতুন বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও পরিচালন সক্ষমতা যুক্ত হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ ঘাটতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত উৎপাদনব্যবস্থাকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করা হবে।
চুক্তির আওতায় ভেনেজুয়েলার ১৭টি কৌশলগত তেলক্ষেত্র উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব ক্ষেত্রের উৎপাদন বাড়িয়ে দৈনিক দেড় কোটি ব্যারেলের বেশি করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। পরবর্তী সময়ে আরও কয়েকটি নতুন তেলক্ষেত্র উন্নয়নের সুযোগ তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে।
ভেনেজুয়েলার নেতৃত্বের প্রত্যাশা, নতুন বিনিয়োগ ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে দেশের তেলশিল্প আবারও শক্তিশালী অবস্থানে ফিরবে। দেশটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণিত অপরিশোধিত তেল মজুতের অধিকারী হলেও দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগের ঘাটতি, অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে এর উৎপাদন সক্ষমতা ব্যাপকভাবে কমে গেছে। নতুন চুক্তির মাধ্যমে সেই পরিস্থিতি বদলানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
রদ্রিগেজ জানিয়েছেন, প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের মূল্য ৬৫ মার্কিন ডলার ধরে হিসাব করলে চুক্তির আওতায় ভেনেজুয়েলা প্রায় ২০ হাজার ৯৩৩ কোটি ৫০ লাখ ডলার রাজস্ব পেতে পারে। এর মধ্যে উৎপাদিত ও বিক্রি হওয়া প্রতি ব্যারেল তেল থেকে প্রায় ১৯ ডলার সরাসরি দেশটির সরকারি কোষাগারে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে।
চুক্তিতে ভেনেজুয়েলার জন্য রাজস্বের পাশাপাশি রয়্যালটি ও আয়কর দেওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে বলে দেশটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এসব আর্থিক সুবিধা কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ত্বরান্বিত করা এবং রাষ্ট্রীয় আয় বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে।
তবে চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বিষয়গুলোর একটি হলো প্রাকৃতিক সম্পদের মালিকানা ও সার্বভৌমত্ব। রদ্রিগেজ স্পষ্ট করে বলেছেন, বিদেশি বিনিয়োগ ও অংশীদারত্ব থাকলেও ভেনেজুয়েলার প্রাকৃতিক সম্পদের মালিকানা এবং সার্বভৌম অধিকার দেশটির হাতেই থাকবে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চুক্তিটিকে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল চুক্তি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার বিপুল প্রমাণিত তেল মজুতের ওপর অংশীদারত্বের মাধ্যমে বড় ধরনের নিয়ন্ত্রণ ও প্রবেশাধিকার পাবে। বিভিন্ন মার্কিন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও ভবিষ্যৎ বিনিয়োগে যুক্ত হতে পারে।
চুক্তির মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার তেল খাতে যুক্তরাষ্ট্রের মূলধন, প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা দক্ষতা প্রবেশ করবে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন অবহেলিত তেল অবকাঠামো পুনর্গঠন, উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো এবং বাজারজাতকরণ ব্যবস্থাকে কার্যকর করার ক্ষেত্রে এসব সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
তবে চুক্তির বাস্তব সুফল পেতে সময় লাগতে পারে বলে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। ভেনেজুয়েলার পুরোনো ও ক্ষতিগ্রস্ত তেল অবকাঠামো পুনর্গঠনে বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। ফলে চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার পরপরই উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছানো সম্ভব হবে না।
চুক্তিটি নিয়ে ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরেও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সমালোচকদের কেউ কেউ মনে করছেন, এতে দেশটির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব আরও বাড়তে পারে। অন্যদিকে ভেনেজুয়েলা সরকার এটিকে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, তেলশিল্প আধুনিকায়ন এবং রাষ্ট্রীয় আয় বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখছে। চুক্তির বিভিন্ন শর্ত ও বিনিয়োগের তথ্য জনগণের সামনে স্বচ্ছভাবে তুলে ধরার কথাও জানিয়েছে দেশটির সরকার।
সব মিলিয়ে ২৫ বছরের এই জ্বালানি চুক্তি ভেনেজুয়েলার তেলশিল্প ও অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে নির্ধারিত উৎপাদন ও রাজস্বের লক্ষ্য কতটা বাস্তবায়িত হবে, তা নির্ভর করবে বিনিয়োগের গতি, অবকাঠামো উন্নয়ন, রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের ওপর।



