রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ভেনেজুয়েলার তেলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শতবর্ষের চুক্তি

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২, ২০২৬, ০৮:০১ পিএম

ভেনেজুয়েলার তেলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শতবর্ষের চুক্তি

ছবিঃ সংগৃহীত

ভেনেজুয়েলার বিপুল তেলসম্পদ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ১০০ বছরের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করেছে দেশটির অন্তর্বর্তী সরকার। বুধবার রাজধানী কারাকাসে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির আওতায় ভেনেজুয়েলার ১৭টি তেলক্ষেত্রে এক শতাব্দী ধরে কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ পাবে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন প্রতিষ্ঠানটি। তবে এত দীর্ঘ সময়ের জন্য দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের অধিকার দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গন ও বিশেষজ্ঞ মহলে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে।

চুক্তির আওতায় থাকা ১৭টি তেলক্ষেত্রে আনুমানিক ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল মজুত রয়েছে। এই পরিমাণ ভেনেজুয়েলার প্রমাণিত মোট তেল মজুতের এক-পঞ্চমাংশেরও বেশি। ফলে দেশটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদের বড় একটি অংশ দীর্ঘ সময়ের জন্য বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের আওতায় চলে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সমালোচকেরা।

চুক্তিটিকে ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ ঐতিহাসিক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার দাবি, এই সমঝোতার ফলে দেশটিতে প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ আসতে পারে। পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলে তিনি মনে করছেন। তার মতে, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার দুর্বল হয়ে পড়া তেল খাতকে পুনর্গঠন করা এবং উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চুক্তিটিকে বিশ্বের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় তেল চুক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভেনেজুয়েলা ও ইরানবিষয়ক সাবেক বিশেষ প্রতিনিধি এলিয়ট অ্যাব্রামস এ চুক্তির কঠোর সমালোচনা করেছেন। তার অভিযোগ, ভেনেজুয়েলার জাতীয় সম্পদের প্রায় ২০ শতাংশ কোনো যথাযথ বিনিময় ছাড়াই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কারণেই এত দীর্ঘমেয়াদি শর্তে সমঝোতায় যেতে হয়েছে।

চুক্তির কাঠামো অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র সরকার ভেনেজুয়েলার বেসরকারি তেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান নর্থ আমেরিকান ব্লু এনার্জি পার্টনার্সের সঙ্গে কাজ করবে। প্রতিষ্ঠানটি দেশটির অন্যতম বড় বেসরকারি তেল উৎপাদক। চুক্তিতে পরিচালনা পর্ষদ নিয়োগের ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ প্রভাব রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। পরিচালনা পর্ষদের যেকোনো সদস্য নিয়োগে মার্কিন সরকারের আপত্তি জানানোর ক্ষমতা থাকবে। একই সঙ্গে পর্ষদের অধিকাংশ সদস্যকে মার্কিন নাগরিক হতে হবে।

বিশ্বের জ্বালানি বাজারেও এ চুক্তির সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ ও দামের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হলে বিশ্ববাজারে নতুন সরবরাহ যুক্ত হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ডগ বার্গাম দাবি করেছেন, এর ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি ব্যবস্থার নির্ভরতা মধ্যপ্রাচ্যের ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল থেকে পশ্চিম গোলার্ধের দিকে সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

তবে বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন দ্রুত বাড়ানো নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং বিনিয়োগের ঘাটতির কারণে দেশটির তেল খাত বর্তমানে নানা সমস্যায় রয়েছে। ফলে চুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই উৎপাদন ব্যাপকভাবে বাড়ানো সম্ভব হবে না বলে তাদের ধারণা।

ট্রাম্প দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে চুক্তি থেকে লাভ পাওয়ার আশা প্রকাশ করলেও জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, উৎপাদনকে উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে ফিরিয়ে নিতে আরও দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হতে পারে। রাইস বিশ্ববিদ্যালয়ের বেকার ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ লুইস পাচেকোর হিসাব অনুযায়ী, প্রায় তিন দশক আগের উৎপাদন পর্যায়ে ফিরতে ভেনেজুয়েলার তেল খাতে আট বছরে প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রয়োজন হতে পারে।

চুক্তি নিয়ে ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক বিরোধও তীব্র হয়েছে। বিরোধী দলগুলোর একটি অংশের অভিযোগ, তেলসম্পদ নিয়ে এই সমঝোতার মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হচ্ছে। একই সঙ্গে দ্রুত জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা না থাকায় তাদের ক্ষোভ বাড়ছে। বিরোধীদের দাবি, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার পরিবর্তে দেশের সবচেয়ে মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

ক্ষমতাসীন সমাজতান্ত্রিক দল চুক্তিটির প্রতি সমর্থন জানালেও দলটির বাইরের অনেক সমাজতন্ত্রী এর বিরোধিতা করছেন। তাদের যুক্তি, দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের বিরোধিতা করে আসার পর এখন দেশের গুরুত্বপূর্ণ তেলসম্পদের বড় অংশ সেই দেশের নেতৃত্বাধীন প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে।

ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রীয় তেল প্রতিষ্ঠানের সাবেক প্রধান ও সাবেক তেলমন্ত্রী রাফায়েল রামিরেজও চুক্তিটির সমালোচনা করেছেন। তার মতে, এই সমঝোতা দেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ধরনের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি করতে পারে।

ফলে একদিকে বিপুল বিনিয়োগ ও তেল উৎপাদন বাড়ানোর সম্ভাবনা, অন্যদিকে জাতীয় সম্পদের নিয়ন্ত্রণ ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ—দুই বিপরীত অবস্থানের মধ্যেই ভেনেজুয়েলার শতবর্ষের তেল চুক্তি এখন দেশটির রাজনীতিতে বড় বিতর্কের বিষয় হয়ে উঠেছে।

মাতৃভূমির খবর

Advertisement
Advertisement
Link copied!