রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

নেপালে ধ্বংসস্তূপে বসে মালিকের অপেক্ষায় বিশ্বস্ত কুকুর

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২, ২০২৬, ০২:১০ পিএম

নেপালে ধ্বংসস্তূপে বসে মালিকের অপেক্ষায় বিশ্বস্ত কুকুর

ছবি: সংগৃহীত

নেপালের ভয়াবহ বন্যা কেড়ে নিয়েছে মানুষের ঘরবাড়ি, স্বজন ও বহু বছরের পরিচিত জীবন। ত্রিশূলী বাজারের ধ্বংসস্তূপে সেই হারানোর এক হৃদয়স্পর্শী চিত্র হয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি কালো-সাদা কুকুর। চারপাশে কেবল কাদা, পলি, ভাঙা ঘরের অংশ আর উদ্ধারকাজের ব্যস্ততা। তবুও এসবের মধ্যে নিজের পরিচিত জায়গাটি আঁকড়ে বসে আছে প্রাণীটি। যেন অপেক্ষা করছে তার প্রিয় মানুষগুলোর ফিরে আসার।

নেপালের নুয়াকোট জেলার ত্রিশূলী বাজারে গত সপ্তাহের ভয়াবহ বন্যায় সারিবদ্ধ চারটি বাড়ি সম্পূর্ণভাবে ভেসে যায়। প্রবল স্রোতে বসতবাড়িগুলো ধ্বংস হওয়ার পর সেখানে পড়ে থাকে বিপুল পরিমাণ মাটি, কাদা ও ধ্বংসাবশেষ। সেই ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই পুরোনো উঠানের জায়গায় দিনের পর দিন অবস্থান করছে কুকুরটি। তার গলায় থাকা বেল্টটিও এখনো অক্ষত রয়েছে।

উদ্ধারকাজে যুক্ত ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, শুরুতে কুকুরটিকে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। খাবার দেওয়া, বিস্কুট খাওয়ানো এবং বিভিন্নভাবে ডাকাডাকি করেও তাকে স্থান পরিবর্তনে রাজি করানো যায়নি। কোনোভাবেই পরিচিত জায়গা থেকে তাকে সরানো সম্ভব হয়নি।

উদ্ধারকর্মীরা এখনো নিশ্চিতভাবে জানতে পারেননি, কুকুরটির মালিক কে ছিলেন। বন্যায় ভেসে যাওয়া চারটি বাড়ির কোনটিতে প্রাণীটি থাকত, সেটিও স্পষ্ট নয়। তবে ধ্বংসস্তূপের নির্দিষ্ট একটি জায়গায় তার দিনের পর দিন অবস্থান করাটা স্থানীয়দের দৃষ্টি কেড়েছে।

ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কারের সময় সেখানে ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হচ্ছে। যন্ত্রের প্রচণ্ড শব্দ, মানুষের চলাচল কিংবা আশপাশের ব্যস্ততা—কোনো কিছুই কুকুরটিকে দীর্ঘ সময়ের জন্য জায়গাটি ছাড়তে বাধ্য করতে পারেনি। মাঝে মাঝে কোনো মানুষের চলাচল বা যানবাহনের শব্দ শুনে সে মাথা তুলে তাকায়। আশপাশে পরিচিত কাউকে দেখতে না পেলে আবার আগের জায়গাতেই গিয়ে বসে বা শুয়ে থাকে।

স্থানীয়দের ধারণা, বন্যার সময় কোনোভাবে প্রাণে বেঁচে যাওয়া কুকুরটি হয়তো তার পরিচিত মানুষদের ফিরে আসার অপেক্ষায় রয়েছে। নিজের আশ্রয় ধ্বংস হয়ে গেলেও সেই স্থান ছেড়ে না যাওয়ার কারণ হিসেবে অনেকেই তার মানুষের প্রতি গভীর টানকেই দেখছেন।

প্রাণীটির যত্ন নেওয়ার জন্য স্থানীয় পশুকল্যাণকর্মীরাও এগিয়ে এসেছেন। নিয়মিত তার জন্য খাবার ও পানি রেখে যাওয়া হচ্ছে। আশপাশের পরিবেশ কিছুটা শান্ত হলে কুকুরটি ধ্বংসস্তূপ থেকে বেরিয়ে এসে খাবার খেয়ে আবার নিজের পরিচিত জায়গায় ফিরে যায়। মানুষের ভিড় বাড়লে কিংবা উদ্ধারকাজ তীব্র হলে সে সেখানেই অবস্থান করে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, বন্যার পানি দ্রুত বাড়তে শুরু করার সময় এলাকার অনেক কুকুর নিরাপদ স্থানে চলে যেতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু এই কুকুরটি তার পরিচিত বাড়ি ও উঠান ছেড়ে যায়নি। ফলে ধারণা করা হচ্ছে, জায়গাটির সঙ্গে তার গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

বন্যায় ঘর হারানো স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, মানুষ অন্তত বুঝতে পারে তার স্বজন বা বাড়িঘরের কী হয়েছে। কিন্তু একটি প্রাণী হয়তো তা বুঝতে পারে না। তার কাছে পরিচিত মানুষগুলো হঠাৎ করে কোথাও চলে গেছে। তাই তারা ফিরে আসবে—এই আশাতেই হয়তো ধ্বংসস্তূপের মধ্যে বসে রয়েছে কুকুরটি।

নেপালের সাম্প্রতিক বন্যায় অসংখ্য মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং অনেক পরিবার তাদের প্রিয়জন ও সম্পদ হারিয়েছে। সেই ভয়াবহতার মাঝেও ধ্বংসস্তূপের ওপর একটি কুকুরের নীরব অপেক্ষা মানুষের মনে নাড়া দিয়েছে। প্রাণীটির মালিক শেষ পর্যন্ত ফিরে আসবেন কি না, তা এখনো অজানা। কিন্তু তার অপেক্ষার দৃশ্যটি মানুষের সঙ্গে প্রাণীর গভীর বন্ধন ও বিশ্বস্ততার এক মর্মস্পর্শী উদাহরণ হয়ে উঠেছে।

মাতৃভূমির খবর

Advertisement
Advertisement
Link copied!