প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২, ২০২৬, ০৭:১৫ পিএম
হিমালয় অঞ্চলে সাম্প্রতিক ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির পর জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতির জন্য যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও চীনের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে নেপাল। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল বলেছেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনে তুলনামূলকভাবে কম ভূমিকা থাকা সত্ত্বেও নেপালকে এর ভয়াবহ পরিণতি বহন করতে হচ্ছে। তাই ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর প্রতি শুধু সহায়তা নয়, দায়বদ্ধতার ভিত্তিতে সহযোগিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
প্রায় এক সপ্তাহ আগে ভোতেকোশি নদীতে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় নেপালের অন্তত তিনটি জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সীমান্তবর্তী উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে হিমবাহ ধসে বিপুল পরিমাণ বরফশীতল পানি, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ নেমে আসার ফলে মুহূর্তের মধ্যে নদীর পানি ভয়াবহ রূপ নেয়। এতে নদীর আশপাশের গ্রাম, সড়ক, সেতু ও বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক মানুষ হতাহত ও নিখোঁজ হন।
দুর্যোগের পর উদ্ধার তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। বিপুল প্রাণহানির পাশাপাশি বহু মানুষ এখনো নিখোঁজ থাকায় ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র পুরোপুরি নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা ও প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে উদ্ধারকাজেও নানা ধরনের বাধার সৃষ্টি হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে নেপাল আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জলবায়ুজনিত ক্ষয়ক্ষতির ন্যায্য হিস্যার দাবি জোরালো করেছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যেসব দেশ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে, তাদের জন্য ধনী ও অধিক নিঃসরণকারী দেশগুলোর বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে। দুর্যোগের পর আর্থিক সহায়তাকে তিনি কেবল মানবিক সহায়তা হিসেবে দেখার পরিবর্তে নৈতিক ও ন্যায্য দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন।
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, দেশটির নিজস্ব গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ বৈশ্বিক উষ্ণায়নের তুলনায় খুবই সামান্য। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে হিমবাহ দ্রুত গলে যাওয়া, পাহাড়ি ঢল, ভূমিধস এবং আকস্মিক বন্যার মতো দুর্যোগের ঝুঁকি দেশটিতে বাড়ছে। ফলে যেসব দেশ দীর্ঘদিন ধরে বিপুল পরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ করে আসছে, তাদের ঐতিহাসিক দায়ও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
তিনি চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণকারী দেশগুলোর মধ্যে উল্লেখ করে এসব দেশের প্রতি জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। নেপালের দাবি, ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন ও কার্যকর সহযোগিতা ছাড়া হিমালয় অঞ্চলের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি সামাল দেওয়া কঠিন হবে।
নেপালের পক্ষ থেকে আরও সতর্ক করা হয়েছে, হিমালয়ের হিমবাহ দ্রুত হারে গলে যেতে থাকলে শুধু নেপাল নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়াই বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে। হিমালয় থেকে উৎপন্ন গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলোর পানির প্রবাহের ওপর কোটি কোটি মানুষ নির্ভরশীল। এসব নদীর পানির নিরাপত্তা ব্যাহত হলে কৃষি, পানীয় জল, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং মানুষের জীবন-জীবিকায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে।
নেপাল তাই জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পাশাপাশি ন্যায়সংগত ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থার দাবি সামনে আনছে। দেশটির মতে, যে সংকট তৈরিতে তাদের অবদান অত্যন্ত কম, সেই সংকটের সবচেয়ে বড় মূল্য তাদেরই দিতে হচ্ছে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলায় দায়, ন্যায়বিচার ও ক্ষতিপূরণকে আন্তর্জাতিক আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ করার দাবি জানাচ্ছে কাঠমান্ডু।



