রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

২ হাজার রুপি ধার করে ছেলের খোঁজে ধ্বংসস্তূপে বাবা

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬, ১২:২২ পিএম

২ হাজার রুপি ধার করে ছেলের খোঁজে ধ্বংসস্তূপে বাবা

ছবিঃ সংগৃহীত

নেপালের ভয়াবহ বন্যার পর একমাত্র নিখোঁজ ছেলেকে খুঁজতে ঋণ করে পথে নেমেছেন পঞ্চাশোর্ধ্ব এক বাবা। হাতে সামান্য অর্থ, পায়ে দীর্ঘ পথ হাঁটার ক্লান্তি—কোনো কিছুই তাকে থামাতে পারছে না। ছেলের সন্ধান না পাওয়া পর্যন্ত বাড়ি ফিরবেন না, এমন দৃঢ় সংকল্প নিয়েই বন্যাকবলিত এক এলাকা থেকে আরেক এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন সাপ্তারির বাসিন্দা তালকা সদা।

তালকা সদার ১৯ বছর বয়সী একমাত্র ছেলে বিনোদ গত ২৬ আগস্ট নেপালে আকস্মিক বন্যার পর থেকে নিখোঁজ। বন্যার প্রায় এক মাস আগে কাজের সন্ধানে রসুয়া জেলায় গিয়েছিলেন বিনোদ। সেখানে একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছিলেন তিনি। প্রকল্পে সিমেন্ট মেশানোসহ বিভিন্ন ধরনের শ্রমের কাজ করতেন তরুণটি।

বন্যার আগের দিন ছেলের সঙ্গে সর্বশেষ কথা হয়েছিল তালকার। এরপর আর কোনো যোগাযোগ হয়নি। প্রবল বন্যা ও পানির স্রোতের পর বিনোদের কোনো খোঁজ না পাওয়ায় উৎকণ্ঠায় দিন কাটতে থাকে পরিবারের সদস্যদের। একই প্রকল্পে বিনোদের সঙ্গে কাজ করা আরও চার তরুণও বন্যার পর নিখোঁজ হয়েছেন। তাদের প্রত্যেকের বয়স ১৭ থেকে ১৯ বছরের মধ্যে।

ছেলের সন্ধানে প্রথমে তালকা তার ভাইকে সঙ্গে নিয়ে সাপ্তারি থেকে রাজধানী কাঠমান্ডুতে যান। সেখানে বিভিন্ন হাসপাতালে ঘুরে বন্যা থেকে বেঁচে যাওয়া মানুষদের মধ্যে ছেলেকে খুঁজেছেন তারা। একই সঙ্গে নিহতদের তালিকাতেও বিনোদের নাম রয়েছে কি না, তা জানার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু কোথাও ছেলের সন্ধান না পেয়ে তারা হতাশ হয়ে পড়েন।

এরপরও হাল ছাড়েননি তালকা। কাঠমান্ডু থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরের নুয়াকোটের দিকে ছেলের সন্ধানে হাঁটা শুরু করেন তিনি ও তার ভাই। ধারণা ছিল, ওই এলাকার আশপাশের কোনো জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে বিনোদের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে তারা ত্রিশূলি শহরে পৌঁছান। ভয়াবহ বন্যার পর শহরটির অনেক এলাকা এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। কোথাও কাদার স্তর, কোথাও জমে থাকা পলি, আবার কোথাও ছড়িয়ে আছে ধ্বংসপ্রাপ্ত স্থাপনার অংশ। সেই ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই ছেলের কোনো চিহ্ন খুঁজে বেড়াচ্ছেন তালকা।

এই দীর্ঘ অনুসন্ধানের খরচ চালাতে তালকা দুই হাজার নেপালি রুপিরও কম অর্থ ধার করেছেন। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণও খুব বেশি নয়। তার ওপর ধার করা অর্থের জন্য সুদও দিতে হচ্ছে। প্রতি ১০০ রুপি ধার নিলে ২০ রুপি করে সুদ দেওয়ার শর্তে এই অর্থ নিয়েছেন তিনি।

সামান্য সেই অর্থও দ্রুত শেষ হয়ে আসছে। ত্রিশুলিতে আর এক রাত থাকলে হাতে থাকা শেষ টাকাটুকুও শেষ হয়ে যেতে পারে—এমন আশঙ্কা করছেন তালকা। কিন্তু অর্থের সংকট কিংবা দীর্ঘ পথের ক্লান্তি তাকে ছেলের সন্ধান থেকে সরাতে পারছে না।

একজন বাবার কাছে একমাত্র সন্তানের নিখোঁজ হওয়ার যন্ত্রণা যে কতটা গভীর, তালকার বর্তমান অবস্থাই যেন তার নির্মম প্রতিচ্ছবি। দিনের পর দিন হাঁটা, ধ্বংসস্তূপে তল্লাশি, হাসপাতাল ও বিভিন্ন স্থানে খোঁজ নেওয়া—সবকিছুর পরও ছেলের কোনো সন্ধান না পেয়ে তিনি শুধু অপেক্ষা করছেন একটি সুখবরের।

বন্যার পর তালকার প্রতিটি দিন কাটছে আশা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে। কখনো মনে হচ্ছে হয়তো কোনো এক জায়গায় ছেলেকে খুঁজে পাবেন, আবার পরক্ষণেই ভয় জাগছে অজানা আশঙ্কায়। তবুও বিনোদকে খুঁজে পাওয়ার আশা ছাড়েননি তিনি।

ছেলের সন্ধান না পাওয়া পর্যন্ত বাড়ি ফিরবেন না—তালকার এই অবস্থান শুধু একজন বাবার আকুতি নয়, বরং দুর্যোগের মধ্যে স্বজন হারানো মানুষের অসহায় অপেক্ষারও এক করুণ চিত্র হয়ে উঠেছে। ধ্বংসস্তূপের পর ধ্বংসস্তূপ পেরিয়ে তিনি এখনো খুঁজে চলেছেন তার একমাত্র সন্তানকে।

মাতৃভূমির খবর

Advertisement
Advertisement
Link copied!