রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

কাতারের এলএনজি সরবরাহ বন্ধ, বাড়ছে বাংলাদেশের ব্যয়

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬, ০২:০৭ পিএম

কাতারের এলএনজি সরবরাহ বন্ধ, বাড়ছে বাংলাদেশের ব্যয়

ছবিঃ সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধের প্রভাবে হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় বাংলাদেশে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে কাতার। অনিবার্য পরিস্থিতির কারণ দেখিয়ে সরবরাহে এই স্থগিতাদেশ দেওয়ায় দেশের চলমান গ্যাস সংকট আরও জটিল হয়ে উঠেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে এখন আন্তর্জাতিক তাৎক্ষণিক বাজারের ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা বাড়ছে। এতে একদিকে গ্যাসের সরবরাহ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে, অন্যদিকে বাড়ছে আমদানি ব্যয় ও সরকারি ভর্তুকির চাপ।

সরকার ইতোমধ্যে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসের জন্য চারটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের চালান কেনার অনুমোদন দিয়েছে। এর মধ্যে তিনটি চালান তাৎক্ষণিক আন্তর্জাতিক বাজার থেকে এবং একটি স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আওতায় কেনা হবে। চারটি চালান কিনতে সরকারের ব্যয় হবে প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা।

বাংলাদেশের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির অন্যতম প্রধান উৎস কাতার। পাশাপাশি ওমানের সঙ্গেও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি রয়েছে। এসব চুক্তির মাধ্যমে তুলনামূলক স্থিতিশীল দামে দীর্ঘ সময় গ্যাস পাওয়ার সুযোগ থাকে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে সেই নির্ভরযোগ্য সরবরাহ ব্যবস্থাই এখন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

চলতি বছরের মার্চে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের মধ্যে গ্যাস অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর কাতার সরবরাহ কমিয়ে দেয়। জুলাইয়ে একটি চালান এলেও এরপর নিয়মিত সরবরাহ আর স্বাভাবিক হয়নি। সর্বশেষ নভেম্বর পর্যন্ত সরবরাহে বিলম্বের বিষয়টি জানানো হয়েছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির গ্যাস না পাওয়ায় বিকল্প হিসেবে তাৎক্ষণিক আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বেশি দামে গ্যাস কিনতে হচ্ছে বাংলাদেশকে।

তবে সেখানেও চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ৮ থেকে ৯ সেপ্টেম্বর এবং ১ থেকে ২ অক্টোবর সরবরাহের জন্য আহ্বান করা দুটি চালানের বিপরীতে এখনো কোনো প্রতিষ্ঠান প্রস্তাব দেয়নি। এতে নির্দিষ্ট সময়ে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

দুই মাস ধরে চলা গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে শিল্প, বিদ্যুৎ ও আবাসিক খাতে। জুলাই ও আগস্টে একটি ভাসমান গ্যাস টার্মিনাল দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকায় সরবরাহ আরও কমে যায়। পরে টার্মিনালটি চালু হলেও প্রয়োজনীয় পরিমাণ গ্যাস পাওয়া যায়নি। একই সময়ে দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদনও কমেছে। ফলে চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান আরও বেড়েছে।

বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি সামাল দেওয়া। ৬ সেপ্টেম্বর সরবরাহের জন্য সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে একটি গ্যাসের চালান কেনার অনুমোদন দেওয়া হলেও এখনো সরবরাহ নিশ্চিত হয়নি। এ ছাড়া ওই সময়ের জন্য দুই দফা তাৎক্ষণিক বাজারের দরপত্র আহ্বান করেও সরবরাহকারী পাওয়া যায়নি। ফলে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন খাতে গ্যাস সরবরাহে সীমিতকরণ বা বণ্টন ব্যবস্থা চালু রাখতে হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার দেশে মোট ২৩৩ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে। এর মধ্যে দেশীয় উৎস থেকে এসেছে ১৬১ কোটি ৮ লাখ ঘনফুট এবং আমদানি করা গ্যাস থেকে পাওয়া গেছে ৭১ কোটি ২ লাখ ঘনফুট।

এদিকে কম দামে গ্যাস কেনার আশায় আগের দরপত্র বাতিল করে নতুন করে দরপত্র আহ্বান করেও উল্টো সরকারের ব্যয় বেড়েছে। ২৫ থেকে ২৬ সেপ্টেম্বর সরবরাহের একটি চালানের আগের দর ছিল প্রতি একক ২৫ দশমিক ৬২ মার্কিন ডলার। পরে পুনরায় দরপত্রে সর্বনিম্ন দর দাঁড়ায় ২৭ দশমিক ৫৪ ডলার। এতে শুধু ওই চালানেই সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৮০ কোটি টাকা।

একইভাবে ৫ থেকে ৬ অক্টোবর সরবরাহের জন্য আগের দর ছিল প্রায় ২৫ দশমিক ৫ ডলার। পুনরায় দরপত্রে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৬ দশমিক ৬৬৮ ডলার। এতে ওই চালানেও সরকারের বাড়তি ব্যয় হবে প্রায় ৩৭ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে দুটি চালানের ক্ষেত্রেই অতিরিক্ত ব্যয় এক কোটি মার্কিন ডলারের বেশি, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১২৩ কোটি টাকা।

সাম্প্রতিক সময়ের তুলনায় বর্তমান গ্যাস আমদানির ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আগস্টের শেষ দিকে অনুমোদিত দুটি চালানের দাম ছিল যথাক্রমে ২৪ দশমিক ৬২ ও ২৪ দশমিক ২৫ ডলার। এর আগে কেনা একটি চালানের দাম ছিল ২৩ দশমিক ৯৩ ডলার। অথচ এবার তাৎক্ষণিক আন্তর্জাতিক বাজার থেকে কেনা তিনটি চালানের দাম দাঁড়িয়েছে ২৬ দশমিক ৬৭ থেকে ২৮ দশমিক ০৩ ডলারের মধ্যে।

ফলে মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি একক গ্যাসের দাম প্রায় চার ডলার পর্যন্ত বেড়েছে। জুলাইয়ের শেষ দিকে একটি চালান কিনতে যেখানে ৯৪৩ কোটি টাকার কিছু বেশি ব্যয় হয়েছিল, বর্তমানে একই ধরনের একটি চালানের জন্য ব্যয় বেড়ে প্রায় এক হাজার ১৩০ থেকে এক হাজার ১৮৫ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।

এর সঙ্গে বাড়ছে সরকারের ভর্তুকির চাপও। দেশে প্রতি মাসে গড়ে ১০টি গ্যাসের চালান আমদানি করা হয়। এর মধ্যে সাত থেকে আটটি চালানই এখন তাৎক্ষণিক আন্তর্জাতিক বাজার থেকে কিনতে হচ্ছে। প্রতিটি চালানের পেছনে সরকারের ব্যয় হচ্ছে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা। অথচ সেই গ্যাস বিক্রি করে আয় হচ্ছে প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রতিটি চালানে সরকারের লোকসান প্রায় ৭০০ কোটি টাকা পর্যন্ত দাঁড়াচ্ছে।

আগস্ট মাসের গ্যাস আমদানির জন্য সরকার ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে ৪ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, সেপ্টেম্বর মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের দাম তুলনামূলক কম থাকলেও বাংলাদেশকে সরবরাহ নিশ্চিত করতে বেশি দামে চালান কিনতে হচ্ছে। অল্প সময়ে সরবরাহ নিশ্চিত করতে কিছুটা বাড়তি দাম স্বাভাবিক হলেও বর্তমান ব্যবধান সরকারের ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি করছে।

দেশীয় ও আমদানি করা গ্যাস মিলিয়ে বর্তমানে গ্যাসের গড় উৎপাদন ব্যয় প্রতি একক প্রায় ৪৫ টাকায় দাঁড়িয়েছে। ছয় মাস আগে এই ব্যয় ছিল ৩১ টাকা ৪২ পয়সা। অথচ সরকার গড়ে প্রতি একক গ্যাস বিক্রি করছে ২৩ টাকা ৯০ পয়সায়। ফলে উৎপাদন ব্যয় ও বিক্রয়মূল্যের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে কাতার ও ওমান থেকে গ্যাস সরবরাহ আরও অনিশ্চিত হতে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চমূল্য অব্যাহত থাকলে তাৎক্ষণিক বাজার থেকে গ্যাস আমদানির ব্যয় আরও বাড়বে। এর ফলে চলতি অর্থবছরে গ্যাস খাতে সরকারের লোকসান ও ভর্তুকির পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো বিকল্প উৎস থেকে চালান সংগ্রহের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে
 

মাতৃভূমির খবর

Advertisement
Advertisement
Link copied!