রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বাংলাদেশে ৬ লাখ চাকরি হারানোর শঙ্কা বিশ্বব্যাংকের

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: আগস্ট ২৯, ২০২৬, ১২:৪০ পিএম

বাংলাদেশে ৬ লাখ চাকরি হারানোর শঙ্কা বিশ্বব্যাংকের

ফাইল ছবি

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ ও সংঘাতের প্রভাব ক্রমেই বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি এবং পণ্য পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় দেশের শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে সার উৎপাদন কমে যাওয়ায় কৃষি খাতেও তৈরি হচ্ছে নতুন উদ্বেগ। সংকট দীর্ঘায়িত হলে কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি, দারিদ্র্য ও মানুষের আয়-রোজগারে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বিশ্বব্যাংকের এক সাম্প্রতিক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘ হলে বাংলাদেশে প্রায় ছয় লাখ মানুষ চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। একই কারণে চলতি বছরে দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ পাওয়া মানুষের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে।

মূল্যায়ন অনুযায়ী, যুদ্ধ না হলে ২০২৬ সালে বাংলাদেশে প্রায় ১৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠে আসতে পারতেন। কিন্তু যুদ্ধের প্রভাবে সেই সংখ্যা প্রায় পাঁচ লাখে নেমে আসতে পারে। অর্থাৎ সংঘাতের কারণে প্রায় ১২ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা হারাতে পারেন। এর আগে ২০২৫ সালেই দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা আনুমানিক ১৪ লাখ বেড়েছিল।

জ্বালানি খাতেই সংকটের সবচেয়ে সরাসরি প্রভাব দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশের প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহের অর্ধেকের বেশি আসে প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে। কিন্তু দেশের গ্যাস উৎপাদন কয়েক বছর আগের সর্বোচ্চ উৎপাদনের তুলনায় প্রায় ১৫ শতাংশ কমেছে। এর মধ্যে আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের বড় অংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের অর্ধেকেরও বেশি আসে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে। ফলে ওই অঞ্চলের সংঘাত আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি করায় বাংলাদেশও এর চাপ থেকে মুক্ত থাকতে পারছে না।

গ্যাস সংকটের কারণে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও উৎপাদনের সময় কমানো হয়েছে, আবার কোথাও কারখানা বন্ধ রাখার ঘটনাও ঘটেছে। জ্বালানির দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পণ্য উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়ছে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত বাজারদরেও পড়ছে। বিশেষ করে খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লে নিম্নআয়ের মানুষের ওপর চাপ আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি সরকারের ব্যয়ের ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি করছে। চলতি অর্থবছরে জ্বালানি খাতে সরকারি ভর্তুকির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ভর্তুকির এই বাড়তি চাপ সামাল দিতে গিয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তাসহ অন্যান্য খাতে সরকারি ব্যয় কমানোর প্রয়োজন দেখা দিতে পারে।

সংকটের প্রভাব পড়ছে কৃষি খাতেও। দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। সার উৎপাদনের জন্য প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রয়োজন হওয়ায় গ্যাসের ঘাটতি সরাসরি সার উৎপাদনে বাধা সৃষ্টি করছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি ইউরিয়া সার কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে ইউরিয়ার দামও বেড়েছে। সংকট আরও দীর্ঘ হলে সারের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়তে পারেন ছোট ও প্রান্তিক কৃষকেরা।

জ্বালানি ও সরবরাহব্যবস্থার অস্থিরতার প্রভাব স্বাস্থ্য খাতেও পৌঁছাচ্ছে। বিদ্যুৎ সরবরাহে সমস্যা হলে বেসরকারি হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোকে বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে পরিচালন ব্যয় বাড়ছে। আবার দেশের ওষুধশিল্পের একটি বড় অংশ ওষুধ তৈরির কাঁচামাল আমদানির ওপর নির্ভরশীল। হাসপাতালের অধিকাংশ চিকিৎসা সরঞ্জামও বিদেশ থেকে আনতে হয়। ফলে আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থায় ব্যয় বাড়লে স্বাস্থ্যসেবার খরচও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অর্থনীতির এই চাপের সঙ্গে কর্মসংস্থানের ঝুঁকিও বাড়ছে। শিল্পকারখানায় নতুন গ্যাস সংযোগ না পাওয়া, উৎপাদন কমে যাওয়া এবং কোনো কোনো কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শ্রমবাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি এমনিতেই প্রত্যাশার তুলনায় কম। এর মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সংকট পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।

অন্যদিকে দেশে আগে থেকেই উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং সরকারের সীমিত আর্থিক সক্ষমতার মতো সমস্যা রয়েছে। ফলে বাইরের এই সংকটের ধাক্কা সামলানো বাংলাদেশের জন্য তুলনামূলকভাবে কঠিন হয়ে পড়ছে।

সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব শুধু জ্বালানির বাজারেই সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে শিল্প উৎপাদন, কৃষি, পণ্যের মূল্য, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এর সবচেয়ে বড় চাপ নিম্নআয়ের মানুষ ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ওপর পড়তে পারে। তাই জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, উৎপাদন সচল রাখা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াকে অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

মাতৃভূমির খবর

Advertisement
Advertisement
Link copied!