প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৯, ২০২৬, ০৮:৪৮ এএম
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা নতুন করে তীব্র হয়েছে। ইরানের পাঁচটি তেলবাহী জাহাজে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর জর্দানে থাকা একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে ইরান। একের পর এক পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনায় আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
মার্কিন সামরিক কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, গত দুই দিনে ইরান একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজে দুই দফা হামলার চেষ্টা করে। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরানের পাঁচটি তেলবাহী জাহাজকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। এর মধ্যে চারটি জাহাজ ওমান উপসাগরে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল বলে দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। অপর একটি জাহাজে ইরানের উপসাগরীয় উপকূলের কাছে খার্গ দ্বীপের আশপাশে হামলা চালানো হয়েছে।
খার্গ দ্বীপ ইরানের জ্বালানি রপ্তানির ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল মূল ভূখণ্ড থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে এই দ্বীপে পৌঁছানোর পর সেখানকার প্রধান রপ্তানি স্থাপনা ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠানো হয়। ফলে দ্বীপটির আশপাশে কোনো সামরিক তৎপরতা ইরানের তেল রপ্তানির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মার্কিন হামলার পর পাল্টা পদক্ষেপ নেয় ইরান। দেশটির পক্ষ থেকে জর্দানে অবস্থানরত একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার কথা জানানো হয়েছে। জর্দানের সামরিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ২০টি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে ১৮টি ধ্বংস করেছে। বাকি দুটি ক্ষেপণাস্ত্র জনবসতিহীন এলাকায় গিয়ে পড়ে। এতে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে জর্দান।
তবে হামলার লক্ষ্যবস্তু নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বক্তব্যে পার্থক্য রয়েছে। মার্কিন সামরিক কর্তৃপক্ষের দাবি, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার উদ্দেশ্য ছিল একটি মার্কিন নৌযুদ্ধজাহাজকে আঘাত করা। তাদের ভাষ্য, মার্কিন বাহিনী সেই হামলা এড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে এবং কোনো মার্কিন সেনা আহত হননি।
অন্যদিকে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নৌ শাখা কুয়েত ও বাহরাইনের বন্দরে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তেলবাহী জাহাজগুলোর ক্রুদের দ্রুত জাহাজ ছেড়ে যাওয়ার সতর্কতা দিয়েছে। বন্দরে অবস্থানরত কিংবা নোঙর করে থাকা এসব জাহাজ ভবিষ্যতে হামলার লক্ষ্য হতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।
ইরানি তেলবাহী জাহাজে হামলার ব্যাখ্যায় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এসব জাহাজ একটি বড় আর্থিক ছায়া নেটওয়ার্কের অংশ, যার মাধ্যমে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী ও তাদের আঞ্চলিক সহযোগীরা অর্থ পেয়ে থাকে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইরান মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজে হামলা বা হামলার চেষ্টা চালালে যুক্তরাষ্ট্রও তেলবাহী জাহাজকে লক্ষ্য করে পদক্ষেপ নেবে।
এদিকে দুই দেশের সামরিক সংঘাতের প্রভাব ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও পড়তে শুরু করেছে। এশিয়ার বাজারে দিনের শুরুতে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় দেড় শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ৯৯ দশমিক ৪১ ডলারে পৌঁছায়। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় এক দশমিক ছয় শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ৯৪ দশমিক ৫৫ ডলারে ওঠে। সংঘাত আরও বাড়লে জ্বালানি সরবরাহ ও পরিবহনব্যবস্থায় বিঘ্নের আশঙ্কায় তেলের দাম আরও অস্থির হয়ে উঠতে পারে।
এর আগে গত ৫ সেপ্টেম্বরও ইরানের তিনটি তেলবাহী জাহাজে যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালিয়েছিল বলে জানানো হয়। এর আগে ইরানের পক্ষ থেকে একটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরি ও একটি ক্ষেপণাস্ত্রবাহী যুদ্ধজাহাজে হামলার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে ওয়াশিংটন দাবি করে।
সব মিলিয়ে গত এক সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক পাল্টাপাল্টি আক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কয়েক মাসের তুলনামূলক স্থিতিশীলতার পর নতুন করে দুই দেশের সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল পরিবহন, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ও জ্বালানি স্থাপনার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হলে এর প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার, তেলের দাম এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যেও এর বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। এখন দুই দেশের পরবর্তী সামরিক পদক্ষেপের দিকেই নজর রাখছে সংশ্লিষ্ট মহল।



