রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

সুপেয় পানির সংকটে ইসরায়েল

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৫, ২০২৬, ০৭:১০ পিএম

সুপেয় পানির সংকটে ইসরায়েল

ফাইল ছবি

ভূমধ্যসাগরে অস্বাভাবিক মাত্রায় অণুশৈবালের বিস্তার দেখা দেওয়ায় বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে ইসরায়েলের পানি সরবরাহ ব্যবস্থা। উপকূলীয় সমুদ্রজুড়ে কয়েক মাইল এলাকায় ছড়িয়ে পড়া এসব অণুশৈবালের কারণে দেশটির ছয়টি প্রধান লবণাক্ত পানি পরিশোধন কেন্দ্রের মধ্যে পাঁচটি সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। পরে কয়েকটি কেন্দ্র সীমিত সক্ষমতায় চালু করা হলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। এতে ইসরায়েলের পানীয় জলের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

অণুশৈবাল হলো অত্যন্ত ক্ষুদ্র জলজ জীব, যা সাধারণত খালি চোখে দেখা যায় না। সূর্যের আলো, কার্বন ডাই-অক্সাইড এবং পানিতে থাকা বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানের উপস্থিতিতে এগুলো দ্রুত বংশবিস্তার করতে পারে। অনুকূল পরিবেশে অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ অণুশৈবাল তৈরি হলে সমুদ্রের পানিতে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দেয়। এবারের ঘটনাতেও উপকূলের বিস্তীর্ণ অংশে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট পানি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ছয়টি উপকূলীয় লবণাক্ত পানি পরিশোধন কেন্দ্রের পাঁচটিই রোববার বন্ধ হয়ে যায়। পরে কয়েকটি কেন্দ্র আংশিকভাবে কার্যক্রম শুরু করলেও বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মাত্র একটি কেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চলছিল। তবে দেশটির প্রায় ৯৯ শতাংশ এলাকায় পানীয় জলের সরবরাহ তখনও স্বাভাবিক ছিল বলে জানানো হয়েছে।

ইসরায়েলের জন্য পরিস্থিতিটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দেশটি তুলনামূলকভাবে শুষ্ক এবং বড় নদী ও পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাতের অভাবে দীর্ঘদিন ধরে সমুদ্রের পানি পরিশোধনের ওপর নির্ভরশীল। বর্তমানে দেশটির পানীয় জলের বড় একটি অংশ সমুদ্রের লবণাক্ত পানি পরিশোধনের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়। ফলে পরিশোধন কেন্দ্রগুলো একযোগে বন্ধ হয়ে গেলে তা দ্রুত জাতীয় পানি ব্যবস্থায় বড় চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

পানি গবেষকদের মতে, এবারের অণুশৈবালের বিস্তার অন্তত এক ডজন মাইল এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, নীল নদের বদ্বীপসংলগ্ন অঞ্চল থেকে সমুদ্রের স্রোতের সঙ্গে এগুলো ইসরায়েলের উপকূলীয় এলাকায় পৌঁছেছে। গত দুই দশক ধরে উপকূলের পানির মান পর্যবেক্ষণ করা গবেষকেরাও এত বড় পরিসরে অণুশৈবালের বিস্তার আগে দেখেননি বলে জানিয়েছেন।

লবণাক্ত পানি পরিশোধনের ক্ষেত্রে সাধারণত বিশেষ ঝিল্লিনির্ভর পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। প্রথমে সমুদ্রের পানি থেকে বড় কণা ও বিভিন্ন দূষিত পদার্থ সরানো হয়। এরপর অত্যন্ত সূক্ষ্ম ঝিল্লির মধ্য দিয়ে পানি প্রবাহিত করে লবণ, জীবাণু ও ক্ষুদ্র কণা আটকে ফেলা হয়। কিন্তু পানিতে অণুশৈবাল ও সেগুলোর তৈরি বিভিন্ন পদার্থের পরিমাণ বেড়ে গেলে ওই ঝিল্লি দ্রুত আটকে যেতে বা অকার্যকর হয়ে পড়তে পারে। ফলে পুরো পরিশোধন ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

এবারের অস্বাভাবিক পরিস্থিতির পেছনে একাধিক পরিবেশগত কারণ কাজ করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সামুদ্রিক ঝড়ের কারণে পানিতে ভাসমান পদার্থের পরিমাণ বেড়েছে। একই সময়ে সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তারও বেশি ছিল। উষ্ণ পানি, পর্যাপ্ত আলো, পুষ্টি উপাদান, সমুদ্রের স্রোত ও পানির মিশ্রণের মতো কয়েকটি বিষয় একসঙ্গে অনুকূল হয়ে গেলে অণুশৈবালের দ্রুত বিস্তার ঘটতে পারে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে কর্তৃপক্ষ বিকল্প উৎস থেকে পানি সরবরাহ বাড়িয়েছে। গ্যালিলি সাগর থেকে পানি সরবরাহ বৃদ্ধি, ভূগর্ভস্থ পানির কূপ চালু এবং জাতীয় পানি মজুদের ব্যবহার করা হয়েছে। কয়েকটি এলাকায় বাগানে পানি দেওয়া ও সুইমিং পুলে পানি ভরার মতো কাজে সাময়িক বিধিনিষেধও আরোপ করা হয়েছে। তবে কৃষিক্ষেত্রে এর প্রভাব বেশি পড়েছে, বিশেষ করে যেসব কৃষক সেচের জন্য পানযোগ্য মানের পানি ব্যবহার করেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘটনাটি শুধু একটি সাময়িক প্রাকৃতিক সংকট হিসেবে দেখলে চলবে না। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি, স্রোতের পরিবর্তন এবং শক্তিশালী ঝড়ের প্রবণতা বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে অণুশৈবালের এমন বিস্তার আরও ঘন ঘন ঘটতে পারে। পাশাপাশি সমুদ্রে বর্জ্য, সার ও অন্যান্য দূষিত পদার্থের প্রবেশ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

এ ধরনের ঘটনা পানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হিসেবেও দেখা হচ্ছে। কারণ একটি দেশের পানীয় জলের বড় অংশ যদি অল্প কয়েকটি প্রযুক্তিনির্ভর পরিশোধন ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল হয়, তাহলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, তেল দূষণ, সামরিক হামলা কিংবা প্রযুক্তিগত হামলার মতো বিভিন্ন ঘটনায় পুরো সরবরাহ ব্যবস্থাই ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে বিকল্প পানির উৎস ও আরও শক্তিশালী পানি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা নতুন করে সামনে এসেছে।

মাতৃভূমির খবর

Advertisement
Advertisement
Link copied!