প্রকাশিত: মে ১২, ২০২৬, ০১:৩৯ পিএম
দেশের ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। প্রযুক্তিনির্ভর আর্থিক সেবা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে এবার চালু হচ্ছে অনলাইনভিত্তিক ঋণসেবা। নতুন এই ব্যবস্থায় ব্যাংকের শাখায় না গিয়েই মোবাইল ফোন কিংবা ওয়েবসাইট ব্যবহার করে ঋণের আবেদন, যাচাই, অনুমোদন ও অর্থ গ্রহণের পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যাবে। ফলে গ্রাহকদের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানো কিংবা কাগজপত্র নিয়ে বারবার ব্যাংকে যাওয়ার ঝামেলা অনেকটাই কমে আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সোমবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ থেকে এ বিষয়ে একটি নির্দেশনা জারি করা হয়। পরে তা দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠানো হয়েছে। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ডিজিটাল আর্থিক সেবাকে আরো গতিশীল, সহজ ও গ্রাহকবান্ধব করার লক্ষ্যেই এই নতুন ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, একজন গ্রাহক সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত অনলাইন ঋণ নিতে পারবেন। এই ঋণের মেয়াদ সর্বোচ্চ ১২ মাস নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ স্বল্প পরিসরের জরুরি আর্থিক চাহিদা পূরণে এই সেবা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী ও জরুরি প্রয়োজনের গ্রাহকেরা দ্রুত এই সুবিধা নিতে পারবেন।
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ঋণ বিতরণ থেকে শুরু করে কিস্তি পরিশোধ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ডিজিটাল পদ্ধতিতে পরিচালিত হবে। গ্রাহকের পরিচয় যাচাইয়ের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র, আঙুলের ছাপসহ বিভিন্ন ডিজিটাল যাচাইকরণ পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে ব্যাংকগুলোকে। পাশাপাশি ঋণ অনুমোদনের আগে গ্রাহকের ঋণসংক্রান্ত তথ্যও যাচাই করা হবে। যাদের বিরুদ্ধে ঋণখেলাপির অভিযোগ রয়েছে, তারা এই সুবিধার আওতায় আসতে পারবেন না।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরো জানিয়েছে, এই ঋণের সুদহার ব্যাংকগুলো বাজার পরিস্থিতি অনুযায়ী নির্ধারণ করতে পারবে। তবে পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা নেওয়া হলে গ্রাহক পর্যায়ে সর্বোচ্চ সুদহার ৯ শতাংশের বেশি হতে পারবে না। এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জন্য তুলনামূলক কম ব্যয়ে ঋণ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গ্রাহকদের স্বার্থ রক্ষায়ও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ঋণের সুদ, সেবা ফি, অতিরিক্ত চার্জ, বিলম্ব মাশুল কিংবা আগাম ঋণ পরিশোধের শর্ত—সবকিছু আগেই পরিষ্কারভাবে গ্রাহককে জানাতে হবে। গ্রাহকের অনুমতি ছাড়া কোনো ধরনের অতিরিক্ত অর্থ কেটে নেওয়া যাবে না বলেও স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে দ্রুত ডিজিটাল অর্থনীতির বিস্তার ঘটলেও এখনো অনেক মানুষ সহজে ব্যাংকিং সুবিধা পান না। এই অনলাইন ঋণব্যবস্থা চালু হলে গ্রামের মানুষ কিংবা ব্যস্ত নগরজীবনের কর্মজীবীরাও সহজে আর্থিক সহায়তা নিতে পারবেন। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্যও এটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে অনলাইনভিত্তিক সেবা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাইবার ঝুঁকিও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাই নিরাপত্তার বিষয়েও কঠোর অবস্থান নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, নিরাপদ লেনদেন নিশ্চিত করতে দুই ধাপ যাচাইকরণ, বহুমাত্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং এককালীন গোপন সংকেত ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে। এছাড়া গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষায় প্রচলিত আইন ও নীতিমালা কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে।
প্রতিটি ব্যাংককে এই সেবা চালুর আগে নিজস্ব নীতিমালা তৈরি করতে হবে এবং পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন নিতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তি ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় সক্ষমতা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের আর্থিক ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। এতে একদিকে যেমন গ্রাহকসেবা সহজ হবে, অন্যদিকে ব্যাংকিং খাত আরো আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠবে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ডিজিটাল লেনদেনের যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে, এই নতুন সেবা সেটিকে আরো এগিয়ে নেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে অনলাইন ঋণসেবা দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে এটি নগদ অর্থের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ডিজিটাল অর্থনীতিকে আরো শক্তিশালী করবে।



