রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

আর্থিক খাতে বড় সিদ্ধান্ত, পাঁচ আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধের অনুমোদন

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: মে ১৩, ২০২৬, ১০:১০ এএম

আর্থিক খাতে বড় সিদ্ধান্ত, পাঁচ আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধের অনুমোদন

প্রতীকী ছবি

দেশের আর্থিক খাতে দীর্ঘদিনের অস্থিরতা ও অনিয়মের পর এবার কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। উচ্চমাত্রার খেলাপি ঋণ, আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থতা এবং আর্থিক সক্ষমতা হারিয়ে ফেলার কারণে দেশের পাঁচটি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ বা অবসায়নের প্রাথমিক অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আগামী জুলাই মাস থেকে এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ কিংবা অবসায়নের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের গুরুত্বপূর্ণ সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। দীর্ঘ আলোচনার পর সিদ্ধান্তে উপনীত হয় পর্ষদ। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশের আর্থিক খাতকে স্থিতিশীল রাখতে এবং আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

অবসায়নের তালিকায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—এফএএস ফাইন্যান্স, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, আভিভা ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিং। এসব প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের হার ৯৩ শতাংশ থেকে প্রায় শতভাগে পৌঁছে গেছে। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানগুলো যাদের ঋণ দিয়েছিল, তাদের অধিকাংশই সেই অর্থ আর ফেরত দেয়নি। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর নগদ অর্থের প্রবাহ সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে এসব প্রতিষ্ঠান আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে পারছিল না। গ্রাহকেরা মাসের পর মাস এমনকি বছরের পর বছর ঘুরেও নিজেদের সঞ্চয়ের অর্থ তুলতে পারেননি। এতে সাধারণ আমানতকারীদের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও ক্ষোভ তৈরি হয়। পরিস্থিতি এতটাই সংকটপূর্ণ হয়ে ওঠে যে, শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক অবসায়নের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, নতুন ব্যাংক রেজুলেশন আইনের আওতায় এই অবসায়ন কার্যক্রম পরিচালিত হবে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন পরিচালককে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে। তার সঙ্গে আরও দুজন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হবে, যাতে সম্পদ, দায় এবং পাওনাদারদের হিসাব সুষ্ঠুভাবে যাচাই করা যায়।

একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যত অকার্যকর ঘোষণা করা হবে। পরে তাদের সম্পদ বিক্রি, বকেয়া ঋণ আদায় এবং অন্যান্য আর্থিক কার্যক্রম নিষ্পত্তির মাধ্যমে আমানতকারীদের অর্থ পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ব্যক্তি আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হতে পারে। এ জন্য আগামী জাতীয় বাজেটে সরকার প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে। এই আশ্বাস পাওয়ার পরই কেন্দ্রীয় ব্যাংক আনুষ্ঠানিক অবসায়ন প্রক্রিয়ায় এগোচ্ছে।

গত কয়েক বছরে এসব আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে। বিশেষ করে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্বল তদারকির সুযোগে আর্থিক খাতে বড় ধরনের কেলেঙ্কারি ঘটে বলে খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে পিকে হালদার কেলেঙ্কারি। অভিযোগ রয়েছে, তিনি চারটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্তত সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এই অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় পিপলস লিজিং, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, এফএএস ফাইন্যান্স এবং বিআইএফসি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর শেষে এফএএস ফাইন্যান্সের খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ। ফারইস্ট ফাইন্যান্সের ৯৮ দশমিক ৫০ শতাংশ, আভিভা ফাইন্যান্সের ৯৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ, পিপলস লিজিংয়ের প্রায় ৯৫ শতাংশ এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের ৯৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ ঋণ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খেলাপি ঋণের এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য কার্যত মৃত্যুঘণ্টার সমান। কারণ ঋণের অর্থ ফেরত না এলে নতুন বিনিয়োগ, আমানত ফেরত কিংবা স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা সম্ভব হয় না।

এর আগে গত বছরের মে মাসে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মোট ২০টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়। তাদের কাছে জানতে চাওয়া হয় কেন এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হবে না। পরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা যাচাই করে কয়েকটিকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে অবসায়নের জন্য চূড়ান্তভাবে বেছে নেওয়া হয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পদক্ষেপ দেশের আর্থিক খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম, দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত খাতকে পুনর্গঠনের জন্য কঠোর সিদ্ধান্ত প্রয়োজন ছিল। তবে একই সঙ্গে তারা মনে করছেন, শুধু প্রতিষ্ঠান বন্ধ করলেই হবে না; ভবিষ্যতে যেন এমন পরিস্থিতি তৈরি না হয়, সেজন্য শক্তিশালী নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

অন্যদিকে সাধারণ আমানতকারীদের মধ্যে এখনো আতঙ্ক বিরাজ করছে। অনেকেই জানতে চাইছেন, তারা আদৌ পুরো অর্থ ফেরত পাবেন কি না। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, ব্যক্তি আমানতকারীদের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েই পরবর্তী কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।

মাতৃভূমির খবর

Advertisement
Advertisement
Link copied!