প্রকাশিত: মে ১৭, ২০২৬, ০৩:০১ পিএম
ঋণ নিতে ব্যাংকের শাখায় দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানো, ফরম পূরণ, নথিপত্র জমা এবং অনুমোদনের অপেক্ষায় দিনের পর দিন সময় পার করার চিত্র দেশের মানুষের কাছে বহুদিনের পরিচিত। তবে প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে সেই প্রচলিত ব্যবস্থা ধীরে ধীরে বদলে যেতে শুরু করেছে। এখন মোবাইল ফোন বা অনলাইনভিত্তিক সেবার মাধ্যমে ঘরে বসেই ঋণের আবেদন, যাচাই-বাছাই এবং অর্থ গ্রহণের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এই আধুনিক পদ্ধতিকে বলা হচ্ছে ডিজিটাল ঋণ বা ই-ঋণ।
দেশে ডিজিটাল আর্থিক সেবা সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ বিষয়ে নতুন নির্দেশনা জারি করেছে। এর ফলে এখন থেকে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে পুরোপুরি অনলাইনভিত্তিক ঋণসেবা দিতে পারবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর মাধ্যমে দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও সাধারণ গ্রাহকরা সহজে আর্থিক সেবার আওতায় আসতে পারবেন।
ডিজিটাল ঋণ মূলত এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে আবেদন থেকে অনুমোদন পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া সরাসরি শাখায় না গিয়েই সম্পন্ন করা যায়। গ্রাহক ব্যাংকের নির্ধারিত মোবাইলভিত্তিক সেবা, ওয়েবসাইট বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রয়োজনীয় তথ্য প্রদান করে ঋণের আবেদন করতে পারবেন। এরপর সংশ্লিষ্ট ব্যাংক গ্রাহকের লেনদেনের তথ্য, আয়, পূর্বের ঋণের ইতিহাস ও আর্থিক সক্ষমতা বিশ্লেষণ করে ঋণ অনুমোদনের সিদ্ধান্ত নেবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি দেশের জন্য সম্পূর্ণ নতুন কোনো ধারণা নয়। এর আগেও কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও মোবাইলভিত্তিক আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান সীমিত পরিসরে এমন সুবিধা দিয়ে আসছিল। তবে এবার নতুন নির্দেশনার ফলে এটি দেশের সব ব্যাংকের জন্য উন্মুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ আগে দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে সীমিত কিছু প্রতিষ্ঠানে যে সেবা ছিল, এখন তা আরও বিস্তৃত পরিসরে চালু হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, একজন গ্রাহক সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ডিজিটাল ঋণ নিতে পারবেন। এই ঋণের মেয়াদ হবে সর্বোচ্চ এক বছর। অর্থাৎ, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অর্থ ফেরত দিতে হবে। সুদের হার নির্ধারণ করা হবে বাজার পরিস্থিতির ভিত্তিতে। তবে বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন সুবিধার আওতায় দেওয়া ঋণের ক্ষেত্রে সুদের সীমা নির্ধারিত থাকবে, যাতে সাধারণ গ্রাহক তুলনামূলক কম খরচে ঋণ পান।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে আবেদন প্রক্রিয়ায়। আগে ঋণ নিতে একাধিক কাগজপত্র জমা, স্বাক্ষর ও ব্যাংকে উপস্থিত হওয়া বাধ্যতামূলক থাকলেও এখন ডিজিটাল সম্মতি, আঙুলের ছাপভিত্তিক পরিচয় নিশ্চিতকরণ এবং দুই ধাপের নিরাপত্তা যাচাইয়ের মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যাবে। ফলে সময় ও ভোগান্তি দুটোই কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে ডিজিটাল ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে কিছু শর্তও থাকছে। ঋণগ্রহীতার আগের আর্থিক রেকর্ড পরীক্ষা করা হবে। যাদের পূর্বে ঋণখেলাপির ইতিহাস রয়েছে, তারা এই সুবিধা পাবেন না। একই সঙ্গে ব্যাংক গ্রাহকের অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দায়-দেনার তথ্যও যাচাই করবে।
অর্থনীতি বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এই উদ্যোগ বিশেষ করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য সহায়ক হতে পারে। কারণ ছোট অঙ্কের অর্থ দ্রুত পাওয়া গেলে অনেকেই ক্ষুদ্র ব্যবসা শুরু বা জরুরি আর্থিক প্রয়োজন মেটাতে পারবেন। বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, একজন কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বা স্বল্প পুঁজির উদ্যোক্তার জন্য এই অর্থ বড় সহায়তা হতে পারে।
তবে ইতিবাচক দিকের পাশাপাশি কিছু ঝুঁকির বিষয়ও সামনে এসেছে। জামানতবিহীন ঋণ হওয়ায় অর্থ ফেরত না পাওয়ার আশঙ্কা ব্যাংকগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, যদি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক গ্রাহক সময়মতো ঋণ পরিশোধ না করেন, তাহলে ব্যাংকের আর্থিক ক্ষতি হতে পারে। ফলে ব্যাংকগুলো এই সেবায় কতটা আগ্রহ দেখাবে, সেটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
তবুও সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থার দিকে এগোতে হলে এমন উদ্যোগ সময়ের দাবি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সম্পূর্ণ প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং সেবা চালু রয়েছে। বাংলাদেশও ধীরে ধীরে সেই পথেই এগোচ্ছে। বিশেষ করে নগদহীন অর্থনীতি গড়ে তোলা এবং সাধারণ মানুষকে ব্যাংকিং ব্যবস্থার আওতায় আনতে এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বর্তমানে দেশের ডিজিটাল আর্থিক খাত দ্রুত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তাই অনেকের প্রত্যাশা, সঠিক নীতিমালা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে ডিজিটাল ঋণ ভবিষ্যতে দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।



