প্রকাশিত: আগস্ট ৮, ২০২৬, ০৯:৪৫ এএম
দেশে ডিজিটাল লেনদেনের পরিধি দ্রুত বাড়লেও নগদ অর্থের ওপর মানুষের নির্ভরতা কমছে না। বরং ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থাকা নগদ টাকার পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে বেড়ে নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। সাম্প্রতিক হিসাবে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ ৩ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মে শেষে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা। এরপর জুনে তা আরও বেড়ে ৩ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকার ওপরে ওঠে। জুলাইয়ে নগদ অর্থের পরিমাণ ৩ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। ফলে অল্প সময়ের ব্যবধানে মানুষের হাতে ও ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থাকা অর্থের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকারদের মতে, এর পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে একই পরিমাণ পণ্য ও সেবা কিনতে মানুষকে আগের তুলনায় বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। পাশাপাশি দেশের বড় অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি, নগদনির্ভর ব্যবসা, সীমিত আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং ব্যাংক খাতের প্রতি মানুষের আস্থার ঘাটতিও নগদ অর্থ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।
গত কয়েক বছরেও ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ২০১১ সালে এর পরিমাণ ছিল মাত্র ৫৮ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা। ২০২১ সালের জুনে তা বেড়ে ২ লাখ ৯ হাজার ৫১৭ কোটি টাকা এবং ২০২৩ সালের জুনে ২ লাখ ৯১ হাজার ৯১৩ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। এরপর চলতি বছরে তা ৩ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।
সম্প্রতি কয়েকটি ব্যাংককে ঘিরে তৈরি হওয়া আস্থার সংকটও নগদ অর্থ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আতঙ্কে কিছু আমানতকারী ব্যাংক থেকে টাকা তুলে ঘরে বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে নগদ হিসেবে রাখছেন। দুর্বল ব্যাংকগুলো থেকে আমানত প্রত্যাহারের প্রবণতাও এ ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলেছে।
তবে একই সময়ে ব্যাংক আমানতও বাড়ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে ব্যাংকগুলোতে আমানত বেড়েছে ১ লাখ ৬৩ হাজার কোটি টাকার বেশি। মে শেষে ব্যাংক আমানতের মোট স্থিতি দাঁড়ায় ২০ লাখ ৪১ হাজার ৬৯২ কোটি টাকা। অর্থাৎ ব্যাংকে আমানত বাড়ার পাশাপাশি ব্যাংকের বাইরেও নগদ অর্থের পরিমাণ বাড়ছে।
দেশে ডিজিটাল লেনদেনের বিস্তারও উল্লেখযোগ্য। মোবাইল আর্থিক সেবা, ব্যাংকের মুঠোফোনভিত্তিক সেবা, ইন্টারনেট ব্যাংকিং, কার্ড এবং কিউআরভিত্তিক লেনদেন আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। তারপরও নগদ অর্থের ব্যবহার কমছে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল লেনদেনের অবকাঠামো আরও বিস্তৃত করা, ব্যাংক খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির আকার কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
ব্যাংকের বাইরে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থের এই প্রবাহ দেশের আর্থিক ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি সংকেত বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। নগদ অর্থের উৎস, ব্যাংকবহির্ভূত লেনদেন এবং এর সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির সম্পর্ক গভীরভাবে বিশ্লেষণ না করলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।



