প্রকাশিত: আগস্ট ৩১, ২০২৬, ০৯:৩৯ এএম
ছোট ব্যবসায়ীদের করের বোঝা কমাতে নতুন উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, বছরে দুই কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেন করা ব্যবসা ও কোম্পানিকে ন্যূনতম লেনদেনভিত্তিক কর থেকে অব্যাহতি দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। একই সঙ্গে ব্যবসার বার্ষিক লেনদেনের পরিমাণ অনুযায়ী ধাপে ধাপে করহার নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, নতুন কাঠামো বাস্তবায়িত হলে দুই কোটি টাকা পর্যন্ত বার্ষিক লেনদেনের ক্ষেত্রে কোনো ন্যূনতম লেনদেন কর দিতে হবে না। দুই কোটি টাকার বেশি কিন্তু তিন কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেন হলে শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ হারে কর দিতে হতে পারে।
এর পরের ধাপে তিন কোটি টাকার বেশি থেকে চার কোটি টাকা পর্যন্ত বার্ষিক লেনদেনের ব্যবসার জন্য শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ কর নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে। আর চার কোটি টাকার বেশি লেনদেন করা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে বর্তমানের মতো ১ শতাংশ ন্যূনতম লেনদেনভিত্তিক কর বহাল রাখার কথা বলা হয়েছে।
প্রস্তাবটি কার্যকর হলে তুলনামূলকভাবে ছোট ব্যবসা ও প্রতিষ্ঠানের ওপর করের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে। বিশেষ করে যেসব ব্যবসার বিক্রির পরিমাণ কম এবং মুনাফার হারও তুলনামূলকভাবে কম, তাদের জন্য এই উদ্যোগ স্বস্তি আনতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ব্যবসায়ী মহলের পক্ষ থেকেও প্রস্তাবিত পরিবর্তনকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভ্যাট পরামর্শকদের সংগঠনের সভাপতি হাসানুল ইসলাম টিপু এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তার মতে, দেশের অনেক ব্যবসা যখন নানা কারণে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, তখন ছোট ব্যবসায়ীদের করের চাপ কমানোর উদ্যোগ তাদের জন্য ইতিবাচক বার্তা।
তবে তিনি চার কোটি টাকার বেশি লেনদেন করা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও করহার ১ শতাংশের পরিবর্তে শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ করার পক্ষে মত দিয়েছেন। তার মতে, এতে বড় ব্যবসাগুলোও কিছুটা স্বস্তি পেত।
ন্যূনতম লেনদেনভিত্তিক কর পুরোপুরি বাতিলের দাবিও রয়েছে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠনের পক্ষ থেকে সম্প্রতি অর্থমন্ত্রীর কাছে এ কর ব্যবস্থা বন্ধের দাবি জানিয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবটির সারসংক্ষেপ অর্থমন্ত্রীর অনুমোদনের পর বর্তমানে আইনগত যাচাই-বাছাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। সব প্রক্রিয়া শেষ হলে দ্রুত আদেশ জারি হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর একটি অংশের যুক্তি, প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত মুনাফার ভিত্তিতেই কর নির্ধারণ করা উচিত। কারণ কোনো ব্যবসা ভালো বিক্রি করলেও যদি তার মুনাফা কম হয় অথবা লোকসান হয়, সেক্ষেত্রে শুধু লেনদেনের পরিমাণের ওপর কর নির্ধারণ করলে প্রতিষ্ঠানের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে।
একজন ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রশাসকও প্রকৃত আয়ের ভিত্তিতে কর আরোপের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তার মতে, প্রকৃত মুনাফার ওপর কর নিশ্চিত করতে হলে ন্যূনতম লেনদেনভিত্তিক কর ব্যবস্থা পুরোপুরি বাতিল করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে ঢাকা চেম্বারের সভাপতিও বিদ্যমান ব্যবস্থা থেকে পুরোপুরি সরে আসার পক্ষে মত দিয়েছেন। তবে হিসাববিদ স্নেহাশীষ বড়ুয়ার মতে, প্রস্তাবিত করহার কমানো হলে ছোট ব্যবসায়ীরা কিছুটা সুবিধা পাবেন। কিন্তু যেসব বড় প্রতিষ্ঠান কম মুনাফা করছে বা লোকসানে রয়েছে, তাদের জন্য এই পরিবর্তন যথেষ্ট স্বস্তিদায়ক নাও হতে পারে।
বর্তমান ন্যূনতম লেনদেনভিত্তিক কর ব্যবস্থা নিয়ে ব্যবসায়ীদের আপত্তির অন্যতম কারণ হলো—প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত মুনাফার সঙ্গে করের পরিমাণের অসামঞ্জস্য। ২০২৫ সালের বাজেটে ন্যূনতম লেনদেনভিত্তিক কর ১ শতাংশ করা হয়। এর ফলে কম মুনাফা করা কিংবা লোকসানে থাকা অনেক ব্যবসার করের বোঝা বেড়ে যায়।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কোনো প্রতিষ্ঠানের বছরে ৫০ লাখ টাকা বিক্রি হলেও যদি তার মুনাফা হয় মাত্র ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা, তাহলে প্রকৃত আয়ের ভিত্তিতে করের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম হতে পারে। কিন্তু ১ শতাংশ লেনদেনভিত্তিক করের কারণে তাকে ৫০ হাজার টাকা কর দিতে হয়। একইভাবে, এক কোটি টাকা বিক্রি করে পাঁচ লাখ টাকা মুনাফা করা প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত আয়কর তুলনামূলক কম হলেও লেনদেনভিত্তিক করের পরিমাণ দাঁড়ায় এক লাখ টাকা।
এদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রযুক্তিনির্ভর তথ্যব্যবস্থা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তথ্যের মধ্যে সমন্বয় বাড়ায় ব্যবসার প্রকৃত লেনদেন গোপন বা কম দেখানোর সুযোগ আগের তুলনায় কমবে। এর ফলে একদিকে ছোট ব্যবসায়ীরা নির্ধারিত সীমার মধ্যে করের স্বস্তি পাবেন, অন্যদিকে প্রকৃত লেনদেন শনাক্ত হওয়ার কারণে সরকারের রাজস্ব আদায়ও বাড়তে পারে।
সব মিলিয়ে প্রস্তাবিত পরিবর্তনে ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য করের চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে। তবে চার কোটি টাকার বেশি লেনদেনকারী প্রতিষ্ঠানের করহার, প্রকৃত মুনাফাভিত্তিক কর ব্যবস্থা এবং ন্যূনতম লেনদেনভিত্তিক কর পুরোপুরি বাতিলের দাবি নিয়ে আরও আলোচনা প্রয়োজন হবে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও সরকারি আদেশ জারি না হওয়া পর্যন্ত প্রস্তাবিত কাঠামোকেই শেষ সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।



