প্রকাশিত: মে ২১, ২০২৬, ০৮:২৮ এএম
দেশের উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কঠোর মুদ্রানীতির পথে হাঁটছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে এই নীতির প্রভাব এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে দেশের বেসরকারি খাতে। ব্যবসা সম্প্রসারণ, নতুন শিল্প স্থাপন কিংবা উৎপাদন বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় ঋণ পেতে হিমশিম খাচ্ছেন উদ্যোক্তারা। ফলে বিনিয়োগে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে, যা অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, চলতি বছরের মার্চ মাসে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৪ দশমিক ৭২ শতাংশে, যা গত দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তথ্য সংরক্ষণের সীমা বিবেচনায় নিলে এটিকে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে কম ঋণপ্রবাহ বলেও ধরা যায়। দীর্ঘ সময় ধরে চলা সংকোচনমূলক নীতির কারণে ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণে কঠোর অবস্থানে রয়েছে। অন্যদিকে উচ্চ সুদের হার নতুন বিনিয়োগের আগ্রহ অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, কেবল মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য সামনে রেখে অর্থনীতির অন্য গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোকে সংকুচিত করা হলে দীর্ঘমেয়াদে তার বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে বেসরকারি খাত দুর্বল হয়ে পড়লে কর্মসংস্থান, উৎপাদন এবং বাজারে পণ্যের সরবরাহ—সবকিছুতেই নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত বছরের শেষ দিক থেকেই বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে কমছিল। নভেম্বর মাসে প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ। এরপর ধীরে ধীরে তা কমতে থাকে। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে ঋণপ্রবাহ প্রায় স্থির থাকলেও মার্চে বড় ধরনের পতন ঘটে। বর্তমানে বেসরকারি খাতে মোট ঋণের পরিমাণ প্রায় ১৮ লাখ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
বিশ্লেষকদের ভাষ্য, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট এবং নীতিগত অস্পষ্টতা—সব মিলিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অনেক উদ্যোক্তা নতুন উদ্যোগ নেওয়ার বদলে অপেক্ষার নীতি অনুসরণ করছেন। ফলে নতুন ঋণের চাহিদাও কমে গেছে।
সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে উঠে এসেছে সুদের হার। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক ঋণের সুদ ১৪ থেকে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এত বেশি সুদে ঋণ নিয়ে উৎপাদন ধরে রাখা কিংবা নতুন বিনিয়োগ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছেন।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরলেও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ এখনো পুরোপুরি তৈরি হয়নি। আন্তর্জাতিক বাজারের চাপ, জ্বালানির অনিশ্চয়তা এবং নীতিগত দ্বিধা বিনিয়োগকারীদের আস্থায় প্রভাব ফেলছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ঋণপ্রাপ্তির জটিলতা।
ব্যাংক খাতের একাধিক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি জানিয়েছেন, বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোর অনেকেই উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছেন। কোথাও কোথাও কারখানা আংশিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে নতুন ঋণের প্রয়োজনও আগের তুলনায় কমে এসেছে। একই সময়ে ব্যাংকগুলো ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ বিতরণের পরিবর্তে সরকারি নিরাপদ খাতে অর্থ বিনিয়োগে বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে।
পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সরকারি ঋণপত্রে ব্যাংকের বিনিয়োগ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। নিরাপদ মুনাফার কারণে ব্যাংকগুলো এখন সেই দিকেই বেশি ঝুঁকছে। এতে বেসরকারি খাত প্রয়োজনীয় অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তাদের মতে, দীর্ঘদিন এ অবস্থা চলতে থাকলে বিনিয়োগ আরও কমে যাবে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হতে পারে। উৎপাদন কমে গেলে বাজারে পণ্যের সরবরাহেও ঘাটতি দেখা দেবে, যা উল্টো মূল্যস্ফীতিকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
তবে সংশ্লিষ্ট মহল আশাবাদী, উপযুক্ত নীতিসহায়তা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা গেলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব। সুদের হার যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা, ব্যবসাবান্ধব সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা গেলে বেসরকারি খাতে নতুন গতি ফিরতে পারে বলে মনে করছেন তারা।



