প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৩, ২০২৬, ০৫:৩৬ পিএম
দেশের তৈরি পোশাক শিল্পে গত তিন বছরে বড় ধরনের সংকটের চিত্র উঠে এসেছে জাতীয় সংসদে। ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশে চার শতাধিক তৈরি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট দুটি প্রধান পোশাকশিল্প সংগঠনের সদস্যভুক্ত ৪০৫টি কারখানা এ সময়ে উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ করেছে।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে সংসদ সদস্য মো. রুহুল আমিনের এক প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানার মধ্যে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সদস্য ২৮২টি এবং বাংলাদেশ নিটপণ্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সদস্য ১২৩টি। অর্থাৎ এই দুই সংগঠনের হিসাবেই বন্ধ কারখানার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪০৫টিতে।
সংসদ সদস্য তাঁর প্রশ্নে জানতে চান, বর্তমানে দেশে কতগুলো তৈরি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠানের তালিকা কী, কোন কোন কারণে কারখানাগুলো বন্ধ হয়েছে এবং পোশাক শিল্পের উন্নয়নে সরকার কী ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে। জবাবে মন্ত্রী জানান, বন্ধ কারখানাগুলোর পূর্ণাঙ্গ তালিকা সংগ্রহের কাজ এখনো চলমান রয়েছে।
কারখানা বন্ধের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে বলে সংসদে তুলে ধরেন বাণিজ্যমন্ত্রী। এর মধ্যে বৈশ্বিক মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সামরিক সংঘাত, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক মন্দা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতার কথা উল্লেখ করা হয়।
এ ছাড়া অর্থ পাচারের কারণে ব্যাংকিং খাতে সৃষ্ট তারল্য সংকটও পোশাক কারখানাগুলোর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে ইউরোপের বাজারে ভারত ও ভিয়েতনামের সঙ্গে বাণিজ্যিক সুবিধার পার্থক্য এবং বিদেশি ক্রেতাদের নিজস্ব তদারকি ব্যবস্থার কারণে ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলোতে রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়াকেও অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংসদে বাণিজ্যমন্ত্রী আরও জানান, বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের অবস্থান ধরে রাখতে সরকার বিভিন্ন সহায়তা কার্যক্রম চালু রেখেছে। রপ্তানিমুখী দেশীয় বস্ত্র ও পোশাক খাতের বিভিন্ন শ্রেণির উদ্যোক্তাদের জন্য বিকল্প নগদ সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি ইউরোপের বাজারে রপ্তানিকারকদের জন্য বিশেষ সহায়তার ব্যবস্থাও রয়েছে।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য অতিরিক্ত সুবিধা দেওয়ার পাশাপাশি তৈরি পোশাক খাতেও বিশেষ আর্থিক সহায়তা অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছেন তিনি। সরকারের লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের পোশাক পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ধরে রাখা এবং রপ্তানি খাতকে আরও শক্তিশালী করা।
এদিকে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়েও সংসদে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, নিয়মিত বাজার তদারকির পাশাপাশি জেলা পর্যায়ে গঠিত বিশেষ দল ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
অতিরিক্ত মূল্য আদায়, মজুতদারি, কৃত্রিম সংকট তৈরি, মূল্যতালিকা প্রদর্শন না করা এবং অন্যান্য অনিয়মের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে প্রতিযোগিতা কমিশনের মাধ্যমে যোগসাজশ, কারসাজি ও বাজার নিয়ন্ত্রণের মতো কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান তিনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তৈরি পোশাক শিল্প দেশের অর্থনীতি, রপ্তানি আয় ও কর্মসংস্থানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। ফলে একের পর এক কারখানা বন্ধ হওয়ার বিষয়টি শিল্পটির ভবিষ্যৎ সক্ষমতা ও শ্রমবাজারের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। এ পরিস্থিতিতে উৎপাদন ব্যয় কমানো, নতুন বাজার তৈরি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানাগুলোকে টিকিয়ে রাখা এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখার বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বাজার সম্প্রসারণ ও শিল্পে সহায়তা অব্যাহত রাখার কথা জানানো হলেও বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলোর পূর্ণাঙ্গ তালিকা ও সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতি পর্যালোচনার কাজ শেষ হলে পোশাক খাতের সামগ্রিক সংকটের চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।



