রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ক্ষমতার দম্ভ ও বিচারের দণ্ড: ইতিহাসের অমোঘ শিক্ষা

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: নভেম্বর ১৮, ২০২৫, ১০:১৩ এএম

ক্ষমতার দম্ভ ও বিচারের দণ্ড: ইতিহাসের অমোঘ শিক্ষা

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গতকালের দিনটি একটি অভূতপূর্ব মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক দেশের সাবেক একজন প্রধানমন্ত্রীকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সর্বোচ্চ দণ্ডাদেশ দেওয়ার ঘটনা নিছক কোনো ব্যক্তির শাস্তি নয়; এটি একটি রাষ্ট্রের তার অন্ধকার অতীতকে পেছনে ফেলে ন্যায়বিচারের পথে যাত্রার এক বলিষ্ঠ পদক্ষেপ। আজকের পত্রিকাগুলোর প্রধান শিরোনামগুলো—তা 'জুলাই হত্যায় শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড' হোক বা 'প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় হাসিনাকে ফেরতের আহ্বান'—সবকিছুই একটি অমোঘ সত্যকে সামনে নিয়ে এসেছে: অপরাধ করলে শাস্তি একদিন পেতেই হয়।

দীর্ঘদিন যাবৎ এ দেশে এক ধরনের বিচারহীনতার সংস্কৃতি বা 'কালচার অফ ইমপিউনিটি' শেকড় গেড়ে বসেছিল। এই অলিখিত প্রথাটি যেন রাষ্ট্র ও সমাজকে এই বার্তা দিত যে, ক্ষমতার মসনদে আসীন ব্যক্তিরা আইনের ঊর্ধ্বে। তারা যা-ই করুন না কেন, তাদের জবাবদিহি করতে হবে না। 'জুলাই গণঅভ্যুত্থান'-এর সময় সংঘটিত বর্বরতাকে এই সংস্কৃতিরই এক ন্যক্কারজনক প্রদর্শনী হিসেবে দেখেছিল দেশবাসী। 'নয়াদিগন্ত'-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, যখন শত শত তরুণের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হচ্ছিল, তখন অনেকেই হয়তো ভেবেছিলেন এই নৃশংসতার নির্দেশদাতারা কোনোদিন বিচারের মুখোমুখি হবেন না।

কিন্তু ইতিহাস প্রমাণ করে, জনমানুষের স্মৃতিশক্তি ক্ষীণ নয় এবং ন্যায়বিচারের দাবি কখনো তামাদি হয় না। ট্রাইব্যুনালের এই রায় সেই বিশ্বাসকেই পুনরুজ্জীবিত করেছে। এটি 'সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি' বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দায়কে প্রতিষ্ঠিত করেছে, যা ভবিষ্যতের যেকোনো শাসককে এই কঠিন বার্তা দেয় যে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে জনগণের ওপর দমন-পীড়ন চালালে তার পরিণতি ভয়াবহ হতে বাধ্য। 'বণিক বার্তা' যেমন উল্লেখ করেছে, বিশ্বে আরও ৪৭ জন রাষ্ট্রপ্রধান বিভিন্ন সময়ে দণ্ডিত হয়েছেন; এই তালিকাটিই প্রমাণ করে যে রাষ্ট্রক্ষমতা অপরাধের বিরুদ্ধে চিরস্থায়ী ঢাল হতে পারে না।

এই রায় একটি প্রক্রিয়া মাত্র। 'প্রথম আলো'র প্রতিবেদনে আমরা দেখছি, রায়ের প্রতিক্রিয়ায় এখনো সহিংসতার আগুন জ্বলছে। 'নয়াদিগন্ত' যেমনটি ইঙ্গিত করেছে, গুলির নির্দেশদাতা অনেক মধ্যম সারির কর্মকর্তাও হয়তো ধরাছোঁয়ার বাইরে। এই বাস্তবতা স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ন্যায়বিচারের পথটি এখনো দীর্ঘ। 'মানবজমিন'-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, পলাতক আসামিদের প্রত্যর্পণের যে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে, তা সফল করা এই বিচারিক প্রক্রিয়ার পূর্ণতার জন্য অপরিহার্য।

একইসাথে, 'কালের কণ্ঠ'-এর প্রতিবেদনটি ('দেশে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কোনো নারীর ফাঁসি কার্যকরের নজির নেই') একটি ভিন্ন সামাজিক বাস্তবতা তুলে ধরেছে। তবে আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। এখানে মূল বিবেচ্য বিষয় লিঙ্গ বা পদবি নয়, বরং অপরাধের গভীরতা এবং তার স্বচ্ছ বিচার।

এই ঐতিহাসিক রায়টি কোনো রাজনৈতিক প্রতিহিংসার উদযাপন নয়, বরং এটি হওয়া উচিত বিচার বিভাগের স্বাধীনতার এক নতুন সূচনাবিন্দু। এই দণ্ডাদেশ যেন প্রতিটি নাগরিক, প্রতিটি রাজনীতিবিদ এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি ব্যক্তিকে এই কথাটি চিরতরে স্মরণ করিয়ে দেয় যে—অপরাধ যত শক্তিশালীই হোক না কেন, বিচার একদিন হবেই। জুলাইয়ের শহিদদের রক্তের ঋণ শোধ করার প্রথম ধাপ এটি। এই শিক্ষাই হোক আগামীর বাংলাদেশের পাথেয়।

মাতৃভূমির খবর

Advertisement
Advertisement
Link copied!