প্রকাশিত: ডিসেম্বর ৩১, ২০২৫, ০৪:০৯ পিএম
বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে ৩০ ডিসেম্বর, ২০২৫ তারিখটি একটি বড় অধ্যায়ের সমাপ্তি হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণ কেবল একটি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতার বিদায় নয়, বরং এটি স্বাধীনতাপরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিবর্তনের অন্যতম প্রধান এক সাক্ষীর প্রস্থান। আজ মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের জনসমুদ্র এবং জাতীয় পতাকায় মোড়ানো কফিন কেবল একজন ব্যক্তিকে নয়, শ্রদ্ধা জানাচ্ছে একটি দীর্ঘ, সংগ্রামমুখর ও বর্ণাঢ্য ইতিহাসকে।
বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের সূচনা হয়েছিল এক ট্র্যাজিক ও আকস্মিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে। ১৯৮১ সালে স্বামী রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর গৃহকোণ থেকে বেরিয়ে তিনি যখন দলের হাল ধরেন, তখন অনেকেই তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে সন্দিহান ছিলেন। কিন্তু তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, তিনি কেবল একজন রাষ্ট্রপতির সহধর্মিণী নন, বরং নিজস্ব আলোয় উদ্ভাসিত একজন মজ্জাগত রাজনীতিবিদ। বিশেষ করে আশির দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তাঁর ‘আপসহীন’ ভূমিকা তাঁকে জনগণের ‘দেশনেত্রী’তে পরিণত করে। সেই ৯ বছরের রাজপথের সংগ্রামই তাঁকে ১৯৯১ সালে বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অধিষ্ঠিত হতে সহায়তা করেছিল। সংসদীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য।
তাঁর রাজনৈতিক জীবনে চড়াই-উতরাই ছিল প্রবল। তিনি যেমন ক্ষমতার শীর্ষে আরোহণ করেছেন, তেমনি দীর্ঘ কারাবাস, গৃহবন্দিত্ব এবং শারীরিক অসুস্থতার চরম যন্ত্রণাও ভোগ করেছেন। গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি যে প্রতিকূল পরিস্থিতির মোকাবিলা করেছেন, তা তাঁর সহনশীলতা ও মানসিক দৃঢ়তার পরিচয় বহন করে। অসুস্থ শরীর নিয়ে তিনি বছরের পর বছর রাজনীতি থেকে দূরে ছিলেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর নামটুকুই ছিল তাঁর দলের কর্মীদের জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণা। ক্ষমতার বাইরে থেকেও তিনি ছিলেন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
আজ যখন তাঁকে তাঁর স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে সমাহিত করা হচ্ছে, তখন একটি প্রশ্ন সামনে আসে—তাঁর অবর্তমানে বিএনপির রাজনীতি কোন পথে যাবে? বেগম জিয়া ছিলেন দলটির ঐক্যের প্রতীক। তাঁর অনুপস্থিতি দলটির জন্য এক বিশাল শূন্যতা তৈরি করবে, যা পূরণ করা সহজ হবে না। তবে তাঁর রাজনৈতিক দর্শন এবং সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে তাঁর যে অনড় অবস্থান, তা হয়তো আগামী দিনে তাঁর অনুসারীদের পথ দেখাবে।
গণতন্ত্রের পথচলায় মতপার্থক্য থাকবে, সমালোচনা থাকবে—এটাই রাজনীতির সৌন্দর্য। কিন্তু আজ এই শোকের মুহূর্তে জাতি ভেদাভেদ ভুলে একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে যথাযোগ্য মর্যাদায় বিদায় জানাচ্ছে। ইতিহাস তাঁকে মনে রাখবে এমন একজন শাসক হিসেবে, যিনি প্রতিকূল স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়েও নিজের বিশ্বাসে অটল ছিলেন।
আমরা বেগম খালেদা জিয়ার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করি। তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবার ও কোটি কোটি রাজনৈতিক অনুসারীর প্রতি আমাদের গভীর সমবেদনা। বাংলাদেশ ও এর রাজনীতির ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া একটি অমলিন নাম হয়েই বেঁচে থাকবেন।



