রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

মহাকালের সমাপ্তি, এক আলোকবর্তিকার যুগের অবসান

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: এপ্রিল ২৯, ২০২৬, ১০:১৪ এএম

মহাকালের সমাপ্তি, এক আলোকবর্তিকার যুগের অবসান

ফাইল ছবি

পৃথিবীর মাটিতে কিছু মানুষ জন্ম নেন শুধু বেঁচে থাকার জন্য নয়—ইতিহাস হয়ে ওঠার জন্য। তারা সময়ের স্রোতে ভেসে যান না, বরং সময়কে নিজের মতো করে গড়ে তোলেন। তাদের পদচিহ্ন মুছে যায় না; তা মানুষের হৃদয়ে অমলিন হয়ে থাকে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে স্মৃতির আলো হয়ে পথ দেখায়।

তেমনই এক বিরল মানুষ—মানবতা, সততা ও সংগ্রামের এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা, মগর ইউনিয়নের সাবেক জনপ্রিয় চেয়ারম্যান ও জননন্দিত ব্যক্তিত্ব মোহাম্মদ আলী খান আর নেই। দীর্ঘ সংগ্রামী জীবনের পর তিনি গত ২৮ এপ্রিল ২০২৬, মঙ্গলবার ভোর ৬টা ৩০ মিনিটে বার্ধক্যজনিত কারণে প্রায় ৯৩ বছর বয়সে ঢাকাস্থ নিজ বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

তাঁর প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয় ২৮ এপ্রিল ২০২৬, সকাল ১০টায় রাজধানীর লালমাটিয়া শাহী (বিবি) মসজিদ কমপ্লেক্স মাঠে। জানাজার নামাজে ইমামতি করেন মরহুমের পরিবারের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সৌদি আরবের প্রখ্যাত আলেম শায়েখ সাঈদ আলী আল-গামধি। একই দিনে তাঁর নিজ গ্রাম আমিরাবাদ স্কুল মাঠে দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে ইমামতি করেন মরহুমের দীর্ঘদিনের বন্ধু ও সম্মানিত আলেম কাঠিপাড়া পীর সাহেব হুজুর।

প্রচণ্ড বৃষ্টি ও বৈরী আবহাওয়া উপেক্ষা করেও দুই জানাজায় হাজার হাজার মানুষ অংশগ্রহণ করেন। অশ্রুসিক্ত নয়নে তাঁরা প্রিয় এই মানুষটির বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং মহান আল্লাহর কাছে তাঁর জন্য জান্নাতুল ফিরদৌস প্রার্থনা করেন।

তাঁর এই প্রস্থান শুধু একটি জীবনের অবসান নয়—এটি যেন এক আলোকিত যুগের সমাপ্তি। তাঁর বিদায়ে নিস্তব্ধ হয়ে গেছে একটি জনপদ, স্তব্ধ হয়ে আছে অসংখ্য হৃদয়। পরিবার-পরিজন, আত্মীয়স্বজন, সহযোদ্ধা এবং অগণিত গুণগ্রাহী আজ শোকের ভারে নত, কারণ তারা হারিয়েছে শুধু একজন মানুষকে নয়—একজন অভিভাবক, একজন পথপ্রদর্শক, একজন আশ্রয়স্থলকে।

মোহাম্মদ আলী খানের জীবন ছিল এক অনন্য সংগ্রামের কাব্য। জীবনের সকল প্রতিকূলতাকে জয় করে তিনি সাধারণ মানুষ থেকে একজন সফল ব্যবসায়ী এবং পরবর্তীতে জনগণের আস্থাভাজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। সততা, ন্যায়পরায়ণতা ও মানবিকতার কারণে তিনি মানুষের কাছে পরিচিত ছিলেন “গরিবের বন্ধু” নামে। তাঁর ঘর ছিল সর্বদা অসহায় মানুষের জন্য উন্মুক্ত; কেউ সাহায্যের জন্য এসে খালি হাতে ফেরেনি—এমন ঘটনা এলাকায় বিরল।

রাজনৈতিক জীবনে তিনি নিজ ইউনিয়নের একাধিকবার চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং পরবর্তীতে জেলা পরিষদের সদস্য হিসেবেও নির্বাচিত হন। এছাড়া ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত থেকে তিনি উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক কল্যাণে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন। তাঁর দক্ষ নেতৃত্বে ইউনিয়নে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সুশাসন, নিরাপত্তা এবং মানুষের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

জীবনের বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, মিথ্যা মামলা ও নানাবিধ প্রতিকূলতার সম্মুখীন হলেও তিনি কখনো নীতির প্রশ্নে আপস করেননি। সত্য ও ন্যায়ের পথ থেকে এক চুলও বিচ্যুত না হয়ে তিনি শেষ পর্যন্ত মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা, আস্থা ও সম্মান অর্জন করেন—যা কোনো পদ বা ক্ষমতার চেয়েও অধিক মূল্যবান।

ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সাদামাটা, ধর্মপ্রাণ ও মানবদরদী। তাঁর সহধর্মিণী সালেহা বেগম ছিলেন তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, যিনি কঠিন সময়ে তাঁকে সাহস ও প্রেরণা জুগিয়েছেন। স্ত্রীর মৃত্যুর পর তিনি অনেকটাই নিভৃত জীবনযাপন করলেও মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ কখনো কমেনি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি মানুষের কল্যাণ, সমাজের শান্তি ও ন্যায়ের জন্য দোয়া করে গেছেন।

তাঁর জানাজায় সর্বস্তরের মানুষের ঢল নামে; রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গসহ সাধারণ মানুষ অশ্রুসিক্ত চোখে তাঁকে শেষ বিদায় জানান। স্থানীয়দের মতে, তাঁর মতো মানবিক, ন্যায়পরায়ণ ও জনবান্ধব নেতৃত্ব সহজে আর ফিরে আসবে না।

মোহাম্মদ আলী খান কেবল একজন ব্যক্তি নন, তিনি ছিলেন একটি সময়ের প্রতিচ্ছবি, এক জীবন্ত ইতিহাস। তাঁর মৃত্যুতে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। তবে তাঁর আদর্শ, মানবতা ও সেবামূলক জীবন আগামী প্রজন্মকে পথ দেখাবে—এই প্রত্যাশাই এখন সকলের।

আল্লাহ তাআলা তাঁকে জান্নাতুল ফিরদৌস দান করুন—আমিন।

মাতৃভূমির খবর

Advertisement
Advertisement
Link copied!