রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ইন্টার্ন ও পোস্টগ্র্যাজুয়েট চিকিৎসকদের কর্মবিরতি স্থগিত

শহিদুল ইসলাম খোকন

প্রকাশিত: জুন ৯, ২০২৬, ০৯:৫৮ পিএম

ইন্টার্ন ও পোস্টগ্র্যাজুয়েট চিকিৎসকদের কর্মবিরতি স্থগিত

ছবি: সংগৃহীত

দেশের বেসরকারি স্বাস্থ্যখাতে কর্মরত হাজারো নবীন চিকিৎসকের দীর্ঘদিনের বেতন বৈষম্য, অনিশ্চিত কর্মপরিবেশ এবং পেশাগত অসন্তোষের অবসান ঘটাতে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, মেডিকেল কলেজ ও ডেন্টাল কলেজে কর্মরত এন্ট্রি-লেভেল চিকিৎসকদের জন্য একটি যৌক্তিক, সমন্বিত ও মর্যাদাপূর্ণ বেতন কাঠামো প্রণয়নের লক্ষ্যে সাত সদস্যের উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসকদের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল বেসরকারি খাতে ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করা। অবশেষে সেই দাবির প্রতিফলন ঘটল সরকারি উদ্যোগে। স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের জারি করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, কমিটির নেতৃত্ব দেবেন মেডিকেল শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক। আগামী ২০ কর্মদিবসের মধ্যে দেশের বিভিন্ন বেসরকারি স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানে নবীন চিকিৎসকদের বর্তমান বেতন, ভাতা, সুযোগ-সুবিধা ও কর্মপরিবেশ পর্যালোচনা করে সুপারিশসহ একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দিতে হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে বেসরকারি খাতে অনেক নবীন চিকিৎসক অপ্রতুল বেতন, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। অনেক ক্ষেত্রে তাদের পারিশ্রমিক শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশাগত দায়িত্ব ও কর্মঘণ্টার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে একটি ন্যায্য, স্বীকৃত ও মানসম্মত বেতন কাঠামোর দাবি চিকিৎসকদের মধ্যে ক্রমেই জোরালো হয়ে উঠছিল।

চিকিৎসকদের দাবির পরই সরকারের উদ্যোগ

ইন্টার্ন ও পোস্টগ্র্যাজুয়েট চিকিৎসকদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে স্বাস্থ্যখাতের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাম্প্রতিক বৈঠকের পরই কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত আসে। বৈঠকে চিকিৎসকদের বেতন, পেশাগত নিরাপত্তা, কর্মপরিবেশ, ক্যারিয়ার উন্নয়ন এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দাবি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, কমিটি সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে মতবিনিময় করবে এবং নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত চিকিৎসকদের জন্য বাস্তবসম্মত ও সম্মানজনক পারিশ্রমিক কাঠামোর খসড়া প্রস্তুত করবে। এতে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ ও স্বাস্থ্য শিক্ষা বিভাগের যুগ্মসচিবসহ চিকিৎসা শিক্ষা, হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।

২০ কর্মদিবসের মধ্যে সুপারিশ

সরকার কমিটিকে দ্রুত কাজ সম্পন্ন করার নির্দেশ দিয়েছে। আগামী ২০ কর্মদিবসের মধ্যে সুপারিশ চূড়ান্ত করে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের সচিবের কাছে প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। স্বাস্থ্যখাত সংশ্লিষ্টদের মতে, এই সময়সীমা সরকারের আন্তরিকতা ও বিষয়টির প্রতি সর্বোচ্চ গুরুত্বেরই প্রতিফলন।

কর্মবিরতি স্থগিত

এদিকে চিকিৎসকদের প্রধান দাবিগুলো সাত কর্মদিবসের মধ্যে বাস্তবায়নের বিষয়ে ইতিবাচক আশ্বাস দেওয়ার পর ইন্টার্ন ও পোস্টগ্র্যাজুয়েট চিকিৎসকেরা তাদের চলমান কর্মবিরতি স্থগিত করেছেন। চিকিৎসক প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, সরকারের লিখিত আশ্বাসের প্রতি সম্মান জানিয়ে তারা আপাতত কর্মসূচি প্রত্যাহার করেছেন। তবে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বিলম্ব হলে ভবিষ্যতে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হতে পারে।

বয়সসীমা ও পরীক্ষার ফি নিয়েও উদ্যোগ

সমঝোতার অংশ হিসেবে স্বাস্থ্যসচিব ক্বামরুজ্জামান চৌধুরী বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারে প্রবেশের বয়সসীমা বৃদ্ধির বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছেন। পাশাপাশি চিকিৎসকদের দীর্ঘদিনের দাবি অনুযায়ী বিভিন্ন পেশাগত পরীক্ষার ফি যৌক্তিক পর্যায়ে পুনর্নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ানস অ্যান্ড সার্জনসকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ করা হয়েছে।

স্বাস্থ্যখাতে ইতিবাচক বার্তা

স্বাস্থ্যখাত বিশ্লেষকদের মতে, বেসরকারি খাতের নবীন চিকিৎসকদের জন্য স্বীকৃত ও গ্রহণযোগ্য বেতন কাঠামো প্রণয়ন করা গেলে তা দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে। এটি চিকিৎসকদের পেশাগত মর্যাদা ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দক্ষ মানবসম্পদ দেশেই ধরে রাখতে সহায়ক হবে। একই সঙ্গে রোগীদের জন্য স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন এবং একটি অধিকতর রোগীবান্ধব স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, অনিশ্চয়তা ও পেশাগত হতাশার পর সরকারের এই উদ্যোগে আশার আলো দেখছেন নবীন চিকিৎসকেরা। সংশ্লিষ্ট মহলের প্রত্যাশা, ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে দ্রুত কার্যকর বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের স্বাস্থ্যখাতে একটি নতুন দিগন্তের সূচনা হবে।

মাতৃভূমির খবর

Advertisement
Advertisement
Link copied!