রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ভরা মৌসুমেও বাজারে নেই ইলিশ

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: আগস্ট ৯, ২০২৬, ১০:৫০ এএম

ভরা মৌসুমেও বাজারে নেই ইলিশ

সংগৃহীত

বর্ষার মৌসুম প্রায় শেষের দিকে। এই সময়টাতেই সাধারণত নদী ও সাগরে ইলিশের প্রাচুর্য দেখা যায়। কিন্তু এবার চিত্র অনেকটাই ভিন্ন। ভরা মৌসুমেও দেশের বিভিন্ন বাজারে ইলিশের সরবরাহ আশানুরূপ নয়। যে পরিমাণ মাছ পাওয়া যাচ্ছে, তার বড় অংশই তুলনামূলক ছোট। ফলে দামও রয়েছে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, ইলিশের উৎপাদন কমে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। নদীতে নাব্যতা হ্রাস, পানিদূষণ, প্রজননক্ষেত্রের পরিবেশ নষ্ট হওয়া এবং নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে জাটকা ও মা-ইলিশ শিকার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। এর সঙ্গে জলবায়ুর পরিবর্তন ও নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে বাধার প্রভাবও পড়ছে ইলিশের জীবনচক্রে।

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, কয়েক বছর ধারাবাহিকভাবে ইলিশের আহরণ বাড়লেও পরবর্তী সময়ে সেই প্রবণতা থেমে যায়। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশে ইলিশ আহরণ ছিল প্রায় ৫ লাখ ৩২ হাজার টন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা বেড়ে প্রায় ৫ লাখ ৭১ হাজার টনে পৌঁছায়। এরপর উৎপাদন কমতে শুরু করে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আহরণ নেমে আসে প্রায় ৫ লাখ ২৯ হাজার টনে। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও উৎপাদন আরও কমেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

শুধু পরিমাণ কমে যাওয়াই নয়, ইলিশের আকার ছোট হয়ে যাওয়াও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। গবেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, আগে যেখানে বাজারে ৪০০ থেকে ৪৫০ গ্রাম ওজনের ইলিশ তুলনামূলক বেশি দেখা যেত, এখন ৩০০ থেকে ৩৫০ গ্রাম ওজনের মাছের উপস্থিতি বাড়ছে। অতিরিক্ত মাছ ধরার কারণে ইলিশ তার স্বাভাবিক জীবনচক্র সম্পন্ন করার আগেই জালে আটকা পড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ইলিশের জীবনচক্রের সঙ্গে নদী ও সাগরের পরিবেশ নিবিড়ভাবে যুক্ত। সাগরে বেড়ে ওঠা ইলিশ প্রজননের সময় নদীর মিঠাপানিতে ফিরে আসে। কিন্তু নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া, শিল্পবর্জ্যে পানি দূষিত হওয়া, অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন এবং বিভিন্ন অবকাঠামোর কারণে ইলিশের চলাচল ও প্রজনন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

এদিকে বাজারে সরবরাহ কম থাকায় স্বাভাবিকভাবেই বেড়েছে দাম। বর্তমানে ছোট আকারের ইলিশও এক হাজার টাকার বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। এক কেজি ওজনের মাছের দাম প্রায় সাড়ে তিন হাজার টাকা এবং দেড় কেজি ওজনের ইলিশ সাড়ে চার হাজার টাকা পর্যন্ত উঠেছে। ফলে মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য ইলিশ এখন অনেকটাই বিলাসী খাবারে পরিণত হয়েছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, জেলেদের কাছ থেকে মাছ সংগ্রহের পর পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে একাধিকবার হাতবদল হওয়ায় দাম বাড়ে। এর সঙ্গে জ্বালানি, বরফ, পরিবহন ব্যয় এবং বিভিন্ন ধরনের অতিরিক্ত খরচ যুক্ত হয়। কেউ কেউ ভবিষ্যতে বেশি দামে বিক্রির আশায় ইলিশ সংরক্ষণ করায় বাজারে তাৎক্ষণিক সরবরাহও কমে যায়।

মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রগুলোর তথ্যেও সংকটের চিত্র ফুটে উঠছে। খুলনার মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে চলতি মৌসুমে ইলিশের সরবরাহ গত কয়েক বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। দেশের অন্যতম বড় ইলিশের মোকাম পাথরঘাটাতেও সরবরাহ কমে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে হলে শুধু বাজার তদারকি করলেই হবে না; নদী ও প্রজননক্ষেত্র রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নিতে হবে। নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার বন্ধ, জাটকা ও মা-ইলিশ শিকার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ, নদীর নাব্যতা ও পানির মান রক্ষা এবং জেলেদের যথাযথ সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। এসব উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে ভবিষ্যতে ইলিশের উৎপাদন ও আকার দুটিই বাড়ানো সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মাতৃভূমির খবর

Advertisement
Advertisement
Link copied!