রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

দূষণমুক্ত নদী ও বাসযোগ্য পরিবেশ গড়তে সবার দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৬, ২০২৬, ০৩:৫২ পিএম

দূষণমুক্ত নদী ও বাসযোগ্য পরিবেশ গড়তে সবার দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

ছবি: সংগৃহীত

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পরিচ্ছন্ন নদী, নির্মল পরিবেশ এবং বাসযোগ্য নগর নিশ্চিত করতে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, নদী ও পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব কেবল সরকারের একার নয়; প্রত্যেক নাগরিকের সচেতনতা ও দায়িত্বশীল আচরণও এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

রোববার রাজধানীর সচিবালয়ে ঢাকার চারপাশের নদ-নদীর দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে অনুষ্ঠিত এক পর্যালোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। সভায় রাজধানী ঘিরে থাকা নদ-নদীর বর্তমান অবস্থা, দূষণের কারণ, বর্জ্য অপসারণ, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা, নাব্যতা রক্ষা এবং নৌপথের উন্নয়নসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

সভায় বিশেষভাবে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, ধলেশ্বরী, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীর দূষণ নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি গুরুত্ব পায়। এসব নদীর সঙ্গে যুক্ত খাল ও নালা থেকে বর্জ্য অপসারণ, দূষণের উৎস চিহ্নিত করা এবং নদীগুলোর স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বজায় রাখার বিষয়েও আলোচনা করা হয়। একই সঙ্গে রাজধানীর চারপাশে বিদ্যমান বৃত্তাকার নৌপথকে আরও কার্যকর ও উন্নত করার বিষয়েও সংশ্লিষ্টদের মতামত নেওয়া হয়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান প্রজন্মের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি আগামী প্রজন্মের জন্যও একটি পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ পরিবেশ রেখে যাওয়ার দায়িত্ব সবার। নদী দূষণ বন্ধে শুধু সরকারি সিদ্ধান্ত বা নির্দেশনার দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না। ব্যক্তি পর্যায়েও পরিবেশ রক্ষার বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করতে হবে।

রাজধানীর চারপাশের নদীগুলো দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের বর্জ্য ও দূষণের চাপে রয়েছে। বিভিন্ন স্থানে অপরিকল্পিতভাবে বর্জ্য ফেলা, নালা-নর্দমার ময়লা পানির প্রবাহ এবং শিল্পকারখানার বর্জ্য নদীর পানিতে মিশে পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এর ফলে নদীর পানির স্বাভাবিক গুণগত মান নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি জলজ পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় নৌযান চলাচল ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাতেও নানা সমস্যা দেখা দিচ্ছে।

এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইতোমধ্যে যেসব পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, সেগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সভায় তিনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন। একাধিক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বের মধ্যে সমন্বয় না থাকলে নদী রক্ষা কার্যক্রম কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না বলেও আলোচনায় গুরুত্ব দেওয়া হয়।

নদীর দূষণ কমানোর পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রাজধানী ও এর আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে উৎপন্ন বর্জ্য যেন সরাসরি নদী, খাল কিংবা নালায় গিয়ে না পড়ে, সে বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা উঠে আসে। একই সঙ্গে নদীর তীর দখল ও অব্যবস্থাপনার কারণে যাতে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত না হয়, সেদিকেও নজর দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

সভায় নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা এবং পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। নদী সচল থাকলে বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনে সহায়তা পাওয়া যায়। পাশাপাশি নৌপথ ব্যবহার বাড়ানো গেলে সড়কপথের ওপর চাপ কমানো সম্ভব। এ কারণে নদী রক্ষার সঙ্গে নৌপথের উন্নয়নকেও একই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

রাজধানীর চারপাশের নদীগুলোকে ঘিরে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসন, নগর কর্তৃপক্ষ, পরিবেশসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, পানি ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা সংস্থা এবং নৌপরিবহন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত ভূমিকার প্রয়োজন রয়েছে। সভায় সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কর্মকর্তা এবং ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের নগর কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধিরাও অংশ নেন।

সভায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু, শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি এবং নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম উপস্থিত ছিলেন।

এ ছাড়া স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসান, পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ড. সাইমুম পারভেজ, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার এবং বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ঢাকা নৌ অঞ্চলের কমান্ডার রিয়ার অ্যাডমিরাল আবদুল্লাহ-আল-মাকসুসসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সভায় উপস্থিত ছিলেন।

রাজধানীর নদীগুলোকে দূষণমুক্ত করার উদ্যোগ সফল করতে শুধু অবকাঠামোগত ব্যবস্থা নিলেই হবে না, মানুষের আচরণেও পরিবর্তন আনতে হবে। নদীতে ময়লা-আবর্জনা না ফেলা, বর্জ্য নির্দিষ্ট স্থানে রাখা, দূষণ সৃষ্টিকারী কার্যক্রম সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং পরিবেশবিরোধী কর্মকাণ্ড দেখলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো—এসব নাগরিক দায়িত্বও গুরুত্বপূর্ণ।

প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানের মূল বিষয়ও ছিল এই ব্যক্তিগত দায়িত্ববোধ। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ একসঙ্গে কাজ করলেই নদী রক্ষার কার্যক্রম দীর্ঘমেয়াদে সফল হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানীর নদীগুলোকে শুধু পানি প্রবাহের পথ হিসেবে দেখলে হবে না। এগুলো নগরের পরিবেশ, জলাবদ্ধতা নিরসন, জীববৈচিত্র্য, নৌযোগাযোগ ও জনজীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তাই নদী রক্ষায় একদিকে যেমন দূষণের উৎস বন্ধ করা প্রয়োজন, অন্যদিকে নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ, নাব্যতা বজায় রাখা এবং নদীর তীর সংরক্ষণও জরুরি।

পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য ঢাকা রেখে যেতে হলে এখন থেকেই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। এ লক্ষ্যেই নেওয়া পরিকল্পনাগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন এবং সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নাগরিকদের নিজেদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন করার মাধ্যমে নদী ও পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনকে আরও কার্যকর করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

মাতৃভূমির খবর

Advertisement
Advertisement
Link copied!