প্রকাশিত: মার্চ ৪, ২০২৬, ০৯:১৩ এএম
নতুন পে স্কেল, কৃষক কার্ড ও ফ্যামিলি কার্ডসহ নির্বাচনী ইশতেহারের জনবান্ধব অঙ্গীকার বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু করেছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার। তবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে প্রয়োজন বিপুল অর্থ, যা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা, রাজস্ব আদায়ে ধীরগতি এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কঠোর শর্ত—সব মিলিয়ে আগামী বাজেট প্রণয়নে সরকারকে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের আকার হতে পারে আট লাখ ৪৮ হাজার কোটি থেকে সাড়ে আট লাখ কোটি টাকার মধ্যে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ধরা হচ্ছে প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকা। তুলনায়, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের আকার সাত লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা।
চলতি অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি নির্ধারণ করা হয়েছে দুই লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩.৬ শতাংশ। তবে আগামী অর্থবছরে এই ঘাটতি দুই লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে—যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। রাজস্ব প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশিত না হলে ঘাটতি জিডিপির ৪ থেকে ৫ শতাংশেও পৌঁছাতে পারে।
রাজস্ব আহরণে বড় ঘাটতি
National Board of Revenue (এনবিআর)-এর হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই–জানুয়ারি) রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৬০ হাজার ১১৩ কোটি টাকা। এ সময় রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল দুই লাখ ৮৩ হাজার ৭৫১ কোটি টাকা।
রাজস্ব আয়ে এই ধীরগতি ভবিষ্যৎ বাজেট বাস্তবায়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ব্যয়ের চাপ
সরকার আগামী ১০ মার্চ থেকে পরীক্ষামূলকভাবে ফ্যামিলি কার্ড চালু করার ঘোষণা দিয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে কার্ডধারীরা প্রতি মাসে ২,৫০০ টাকা করে পাবেন। সমাজকল্যাণমন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন জানিয়েছেন, আপাতত থোক বরাদ্দ থেকে অর্থ দেওয়া হবে, তবে আগামী বাজেটে এ খাতে নিয়মিত বরাদ্দ রাখা হবে।
এদিকে সরকারি কর্মচারীদের নতুন পে স্কেল কার্যকরের লক্ষ্যে সংশোধিত বাজেটে বেতন-ভাতা খাতে বরাদ্দ প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে এক লাখ ছয় হাজার ৬৮৪ কোটি টাকা করা হয়েছে।
আইএমএফের শর্তে বাড়তি চাপ
৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচির আওতায় International Monetary Fund (আইএমএফ) বাংলাদেশকে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো, ভর্তুকি হ্রাস, ব্যাংক খাতে সংস্কার ও বিদ্যুৎমূল্য সমন্বয়সহ বিভিন্ন শর্ত বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছে। ভর্তুকি কমানোর চাপ থাকায় পে স্কেল বা কৃষক কার্ডের মতো কর্মসূচি বাস্তবায়নে আর্থিক চাপ বাড়বে।
আইএমএফের শর্ত পূরণে ব্যর্থ হলে ঋণের পরবর্তী কিস্তি স্থগিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
বেসরকারি খাতে স্থবিরতা
Bangladesh Bank–এর তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৬.০৩ শতাংশে, যা সাম্প্রতিক সময়ের সর্বনিম্ন। উচ্চ সুদহার ও বিনিয়োগ অনিশ্চয়তায় শিল্প খাতে গতি কমেছে, আমদানি ও উৎপাদন কার্যক্রমেও প্রভাব পড়েছে।
অর্থনীতি বিশ্লেষক মামুন রশীদ সতর্ক করে বলেন, “রাজস্ব ঘাটতি ও বাড়তি ব্যয়ের চাপে বাজেট অর্থায়ন অত্যন্ত কঠিন হবে। বিদেশি ঋণ বা মুদ্রা সরবরাহ বাড়ানোর পথে হাঁটলে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বাড়তে পারে।”
প্রাক-বাজেট আলোচনা শুরু
এমন পরিস্থিতিতে এনবিআর বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন ও অংশীজনদের কাছ থেকে প্রাক-বাজেট প্রস্তাব আহ্বান করেছে। Federation of Bangladesh Chambers of Commerce and Industry (এফবিসিসিআই)-এর মাধ্যমে আগামী ১৫ মার্চের মধ্যে প্রস্তাব জমা দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, এবারের বাজেট হবে অংশগ্রহণমূলক ও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিতকারী। তাঁর মতে, কাঠামোগত সংস্কার, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং সুশাসন নিশ্চিত করাই হবে অগ্রাধিকার।
সব মিলিয়ে, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার টানাপোড়েনে আসন্ন বাজেট দেশের অর্থনীতির জন্য এক বড় পরীক্ষা হয়ে উঠতে যাচ্ছে।



