রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বাংলাদেশে শিক্ষকদের বেতন এশিয়ায় সর্বনিম্ন, প্রতিবেশী দেশগুলোয় তিনগুণ বেশি

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: অক্টোবর ৩১, ২০২৫, ১১:৪২ এএম

বাংলাদেশে শিক্ষকদের বেতন এশিয়ায় সর্বনিম্ন, প্রতিবেশী দেশগুলোয় তিনগুণ বেশি

ছবি: মাতৃভূমির খবর ডিজিটাল

বাংলাদেশে শিক্ষকতা পেশা আজ মর্যাদাহীন ও অবমূল্যায়নের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের শিক্ষকদের বেতন সবচেয়ে কম, প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষক মাসে যেখানে গড়ে পান ১৯ হাজার ৫০০ টাকা, সেখানে ভারতের একই পর্যায়ের শিক্ষক পান অন্তত তিনগুণ বেশি।

দেশের প্রাথমিক সহকারী শিক্ষকদের গ্রেড এখনো ১৩তম, অর্থাৎ সরকারি কাঠামোতে তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীর সমান। স্নাতক–মাস্টার্স ডিগ্রিধারী শিক্ষক যেখানে পান ১১ হাজার টাকা মূল বেতন, সেখানে অষ্টম শ্রেণি পাস একজন গাড়িচালকের গ্রেড ১২তম। বাড়ি ভাড়া ও চিকিৎসা ভাতা যোগ করেও তাদের মাসিক আয় ২০ হাজার টাকাও ছুঁতে পারে না।

অন্যদিকে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের গড় বেতন দাঁড়ায় মাত্র ১২৩ ডলার, যা দেশের গড় মাথাপিছু মাসিক আয়ের চেয়েও প্রায় ১১২ ডলার কম। বাজারে নিত্যপণ্যের লাগামহীন দামে এই আয় দিয়ে সংসার চালানো শিক্ষকদের জন্য হয়ে উঠেছে এক অসম্ভব লড়াই।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৫ সালের জাতীয় বেতন কাঠামো এখনো কার্যকর রয়েছে। ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে সামান্য ভাতা বৃদ্ধি কার্যকর হলেও সেটি বাস্তব জীবনে প্রভাব ফেলবে না বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বর্তমানে স্কুল–২ পর্যায়ের শিক্ষক কর্মজীবন শুরু করেন ১৬তম গ্রেডে, মূল বেতন ৯৩০০ টাকা। ভাতা যোগে মোট বেতন প্রায় ১১,৮০০ টাকা—ডলারে মাত্র ৯৭।

অন্যদিকে, বিএড ডিগ্রিধারী বিশেষায়িত বিষয় শিক্ষক ১০ম গ্রেডে ১৬ হাজার টাকা বেতন পান, যা বাড়িভাতাসহ নভেম্বর ২০২৫-এ দাঁড়াবে ১৮ হাজার ৫০০ টাকা (১৫২ ডলার)। জুলাই ২০২৬-এ বাড়িভাতা ১৫ শতাংশে উন্নীত হলে এটি হবে ১৮,৯০০ টাকা (১৫৫ ডলার)।

তুলনায় ভারতের গুজরাট বা তামিলনাডু রাজ্যে একজন সহকারী শিক্ষক শুরুতেই মাসে পান ৩৫ হাজার রুপি (প্রায় ৪৬০ ডলার), পাকিস্তানে ৩০০ ডলার, নেপালে ২৮০ ডলার এবং ভুটানে ৩১০ ডলার। ফলে বাংলাদেশের শিক্ষকরা দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে কম আয়কারী পেশাজীবী।

বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে দেখা গেছে—শিক্ষক বেতন ১০ শতাংশ বাড়ালে শিক্ষার্থীর শেখার দক্ষতা ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পায় এবং জিডিপি বছরে ০.৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। কিন্তু বাংলাদেশে শিক্ষক বেতন বাড়েনি, বরং তাদের অনুপ্রেরণা ও উপস্থিতি দুই-ই কমছে। মাঠপর্যায়ের তথ্য বলছে, প্রতিদিন বহু শিক্ষক অনুপস্থিত থাকেন, কারণ পরিবার চালাতে তারা কোচিং বা টিউশনি করতে বাধ্য হচ্ছেন।

জাতীয় বেতন কমিশন আগামী জানুয়ারিতে নবম বেতন স্কেল বাস্তবায়নের প্রস্তাব চূড়ান্ত করছে। তাতে সহকারী শিক্ষকদের বেতন ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব রয়েছে—যদিও বাস্তবায়ন না হলে এটি আরেকটি “প্রতীকী পরিবর্তন” হিসেবেই থেকে যাবে বলে আশঙ্কা শিক্ষাবিদদের।

তারা সতর্ক করেছেন—সময় থাকতে পদক্ষেপ না নিলে দেশে স্থায়ীভাবে গড়ে উঠবে দুই শ্রেণির শিক্ষা ব্যবস্থা: ধনীদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা, আর সাধারণের জন্য নিম্নমানের স্কুল। কারণ, আজকের শ্রেণিকক্ষই আগামী রাষ্ট্রের ভিত্তি। শিক্ষককে অবমূল্যায়ন করা মানে—জাতিকেই অবমূল্যায়ন করা।

 

মাতৃভূমির খবর

Advertisement
Advertisement
Link copied!