প্রকাশিত: মে ১৩, ২০২৬, ০১:১৬ পিএম
দেশের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আধুনিক ও নিরাপদ করার লক্ষ্যে বড় ধরনের পুনর্বাসন ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। বিশেষ করে রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলীয় নেটওয়ার্ককে শক্তিশালী করতে নতুন এই উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এতে যাত্রীসেবা উন্নয়ন, মালবাহী পরিবহন সহজীকরণ এবং আঞ্চলিক রেল সংযোগ আরও সম্প্রসারিত হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করেছেন।
জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সাম্প্রতিক বৈঠকে “বাংলাদেশ রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলীয় রেলপথ পুনর্বাসন ও রক্ষণাবেক্ষণ (প্রথম পর্যায়)” শীর্ষক একটি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে দুই হাজার ২৮ কোটি টাকারও বেশি, যা সম্পূর্ণভাবে সরকারি তহবিল থেকে যোগান দেওয়া হবে।
পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পাঁচ বছর মেয়াদি এই প্রকল্পটি রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ রেলওয়ে বাস্তবায়ন করবে। এটি ২০৩১ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রকল্পের প্রধান উদ্দেশ্য হিসেবে নিরাপদ ও নির্ধারিত গতিতে ট্রেন চলাচল নিশ্চিত করা, যাত্রী ও মালবাহী পরিবহন সেবার মান বৃদ্ধি করা এবং দীর্ঘমেয়াদে রেল অবকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় কমানোকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
রেলপথের অবস্থা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পশ্চিমাঞ্চলীয় নেটওয়ার্কের বড় একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার না হওয়ায় জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। অনেক লাইন কয়েক দশক আগে স্থাপন করা হওয়ায় সেখানে ফাটল, জোড়ার দুর্বলতা এবং ট্র্যাক ক্ষয়ের মতো সমস্যা নিয়মিত দেখা দিচ্ছে। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি যেমন বাড়ছে, তেমনি ট্রেনের গতি কমিয়ে চলাচল করাতে হচ্ছে।
সূত্র জানায়, কিছু এলাকায় রেললাইনের ক্ষয়ের হার ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে পৌঁছেছে। পাশাপাশি স্লিপার ও ব্যালাস্টের ঘাটতির কারণে ট্র্যাকের ভারসাম্যও দুর্বল হয়ে পড়েছে। এসব কারণে ট্রেন চলাচলের নিরাপত্তা ও নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
নতুন প্রকল্পের আওতায় কয়েকশ কিলোমিটার রেলপথের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং নির্দিষ্ট অংশে সম্পূর্ণ পুনর্বাসন কাজ করা হবে। গুরুত্বপূর্ণ করিডরগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে ধাপে ধাপে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে জয়দেবপুর থেকে শুরু করে উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চল সংযুক্ত বিভিন্ন রুট অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
পরিকল্পনা কমিশনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, পশ্চিমাঞ্চলীয় রেলপথ দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন করিডর হিসেবে কাজ করছে। এই রুটের মাধ্যমে রাজধানীর সঙ্গে উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগ স্থাপিত হয় এবং বিভিন্ন স্থলবন্দর দিয়ে মালবাহী পরিবহন পরিচালিত হয়। ফলে এই অবকাঠামোর উন্নয়ন জাতীয় অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি আরও জানান, দীর্ঘদিনের পুরোনো অবকাঠামো এবং অতিরিক্ত ট্রেন চলাচলের কারণে লাইনের ওপর চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে ট্র্যাকের স্থায়িত্ব কমে যাচ্ছে এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে। নতুন প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে এসব সমস্যার স্থায়ী সমাধানের আশা করা হচ্ছে।
রেলপথ উন্নয়নের মাধ্যমে আঞ্চলিক সংযোগও আরও শক্তিশালী হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে রেলভিত্তিক বাণিজ্য ও যাত্রী পরিবহন সহজতর হবে এবং আন্তর্জাতিক পরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে বাংলাদেশের সংযোগ আরও গভীর হবে।
এছাড়া দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন আঞ্চলিক যোগাযোগ উদ্যোগের সঙ্গে বাংলাদেশের রেলওয়ে নেটওয়ার্ক আরও কার্যকরভাবে যুক্ত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থায় একটি বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।



