প্রকাশিত: জুন ১৮, ২০২৬, ০৫:০৮ পিএম
দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রাম বন্দর চলতি অর্থবছরে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক অর্জন করেছে। পণ্য পরিবহন, রাজস্ব আয় এবং জাহাজ পরিচালনায় নতুন রেকর্ড গড়ে বন্দর কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, গত কয়েক দশকের মধ্যে এটিই তাদের অন্যতম সফল বছর। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ চাহিদা মোকাবিলায় প্রযুক্তিনির্ভর ও পরিবেশবান্ধব বন্দর গড়ে তোলার পরিকল্পনাও হাতে নেওয়া হয়েছে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কন্টেইনার পরিবহনের পরিমাণ ৩২ লাখ ১৬ হাজারেরও বেশি এককে পৌঁছেছে, যা বিগত ৪৮ বছরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। একই সময়ে ১৩ কোটিরও বেশি মেট্রিক টন পণ্য খালাস ও পরিবহন কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া চার হাজারের বেশি সমুদ্রগামী জাহাজ বন্দরের বিভিন্ন সেবা গ্রহণ করেছে। এসব সূচকে গড়ে প্রায় সাড়ে চার শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
রাজস্ব আয়ের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে বন্দর। গত বছরে বন্দরের মোট আয় পাঁচ হাজার চারশত ষাট কোটিরও বেশি টাকায় পৌঁছেছে, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি নির্দেশ করে। একই সঙ্গে কর-পূর্ব উদ্বৃত্ত আয় তিন হাজার একশত কোটির বেশি হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব খাতেও বড় অবদান রেখেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। ভ্যাট, কর ও অন্যান্য সরকারি খাতে এক হাজার আটশত কোটির বেশি টাকা জমা দিয়ে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে প্রতিষ্ঠানটি।
বন্দর পরিচালনায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগও জোরদার করা হয়েছে। কার্যক্রমকে আরও দ্রুত, স্বচ্ছ এবং সেবাবান্ধব করতে বিভিন্ন ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। এর ফলে জাহাজের অবস্থানকাল উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে এবং আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকরা দ্রুত পণ্য গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছেন। কাগজবিহীন প্রশাসনিক ব্যবস্থা চালুর লক্ষ্যে বিভিন্ন আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক সেবা যুক্ত করা হয়েছে।
বন্দরের ধারণক্ষমতাও বাড়ানো হয়েছে। কন্টেইনার সংরক্ষণের সক্ষমতা আগের তুলনায় কয়েক হাজার একক বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ভবিষ্যতের বাড়তি চাপ মোকাবিলায় সহায়ক হবে। পাশাপাশি কর্ণফুলী নদীর নাব্যতা রক্ষায় পরিচালিত খননকাজেও ব্যয় সাশ্রয়ের নজির স্থাপন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, দক্ষ ব্যবস্থাপনার কারণে সরকারের বিপুল পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় সম্ভব হয়েছে।
এদিকে দেশের বৃহৎ সমুদ্রবন্দর উন্নয়ন প্রকল্পগুলোও দ্রুত এগিয়ে চলেছে। বিশেষ করে উপকূলীয় নতুন টার্মিনাল এবং গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণকাজ ভবিষ্যতে দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে আশা করা হচ্ছে। অর্থায়ন ব্যবস্থাপনায় ব্যয় কমিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা সাশ্রয়ের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার স্বীকৃতি পেয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর। সাম্প্রতিক এক আন্তর্জাতিক মূল্যায়নে কোনো ধরনের পর্যবেক্ষণ ছাড়াই উত্তীর্ণ হওয়াকে বড় অর্জন হিসেবে দেখছে কর্তৃপক্ষ। এছাড়া আন্তর্জাতিক নৌপথ সম্প্রসারণের মাধ্যমে নতুন বাণিজ্যিক সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে পরিবেশবান্ধব ও প্রযুক্তিনির্ভর বন্দর গড়ে তোলার লক্ষ্যে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ব্যবস্থাপনা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০৪০ সালের মধ্যে বন্দরের কার্যক্ষমতা বর্তমানের তুলনায় চারগুণ বৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম বন্দর দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রধান বাণিজ্য ও সরবরাহ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।



