প্রকাশিত: জুলাই ২১, ২০২৬, ০৮:১৬ এএম
এক বছর পেরিয়ে গেলেও রাজধানীর দিয়াবাড়ীতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ভয়াবহ দুর্ঘটনার ক্ষত এখনো শুকায়নি। সেদিন প্রাণে বেঁচে যাওয়া বহু শিক্ষার্থী ও শিক্ষক আজও শারীরিক যন্ত্রণা, মানসিক আঘাত এবং সামাজিক সংকটের সঙ্গে লড়াই করে চলেছেন। কারও হাত স্বাভাবিকভাবে কাজ করে না, কারও মুখমণ্ডল আগুনে বিকৃত হয়ে গেছে, আবার কেউ এখনো আয়নার সামনে দাঁড়াতে সাহস পান না।
দুর্ঘটনার শিকার শিক্ষার্থীদের মধ্যে নুসরাতও একজন। দুর্ঘটনার আগে সে ছিল প্রাণবন্ত, নিজের হাতে নানা ধরনের সৃজনশীল কাজ করতে ভালোবাসত। কিন্তু ভয়াবহ অগ্নিদগ্ধ হওয়ার পর তার জীবন সম্পূর্ণ বদলে গেছে। বর্তমানে নিজের হাতে খাবার খেতেও অন্যের সহযোগিতা প্রয়োজন হয়। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে পুনর্গঠন করা হাতে প্রায়ই ব্যথা ও চুলকানি অনুভব করে। বাইরে গেলে মানুষের কৌতূহলী দৃষ্টি এড়াতে তাকে হাতে কালো দস্তানা পরতে হয়। অতিরিক্ত রোদ কিংবা শীত—দুই পরিবেশেই তার পোড়া চামড়ায় নতুন করে অস্বস্তি তৈরি হয়। ফলে নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকাও সম্ভব হয়ে ওঠে না।
শুধু নুসরাত নয়, দুর্ঘটনায় বেঁচে যাওয়া আরও অনেক শিক্ষার্থী ও শিক্ষক এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। কেউ মাঝেমধ্যে বিদ্যালয়ে গিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে কিছু সময় কাটিয়ে আবার ফিরে আসে। আবার কেউ দীর্ঘ সময় শ্রেণিকক্ষে বসে থাকার মতো শারীরিক সক্ষমতা হারিয়েছেন। অনেকের জন্য প্রতিদিনের সাধারণ কাজও এখন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতের তথ্য অনুযায়ী, ওই দুর্ঘটনায় আহতদের মধ্যে বর্তমানে ৬৩ জন জীবিত রয়েছেন। তাদের মধ্যে অনেকেই দীর্ঘ সময় বিভিন্ন বিশেষায়িত হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। দুর্ঘটনায় মোট ৩৮ জনের মৃত্যু হয়। গুরুতর দগ্ধদের অধিকাংশের শরীরের বড় অংশ আগুনে পুড়ে যাওয়ার পাশাপাশি শ্বাসনালিতেও মারাত্মক ক্ষতি হয়েছিল। চিকিৎসকদের মতে, এমন রোগীদের সুস্থ হওয়ার পথ দীর্ঘ এবং অত্যন্ত জটিল।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, গুরুতর দগ্ধ রোগীর চিকিৎসা হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার মাধ্যমে শেষ হয় না। পোড়া দাগ পুরোপুরি পরিপক্ব হতে দেড় থেকে দুই বছর পর্যন্ত সময় লাগে। এ সময় নিয়মিত পুনর্গঠনমূলক অস্ত্রোপচার, আলোকচিকিৎসা, শারীরিক ব্যায়ামভিত্তিক চিকিৎসা এবং ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন হয়। পাশাপাশি মানসিক পুনর্বাসনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শিশু-কিশোর মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্ঘটনার এক বছর পরও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু গভীর মানসিক আঘাত বহন করছে। অনেকেই বিদ্যালয়ে যেতে ভয় পায়, মানুষের সঙ্গে মিশতে চায় না কিংবা চিকিৎসার প্রয়োজনীয় ব্যায়াম করতেও অনীহা দেখায়। তাদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং দুর্ঘটনার স্মৃতি থেকে সৃষ্ট দীর্ঘস্থায়ী মানসিক সমস্যার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। তাই দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চিকিৎসা ও পারিবারিক সহায়তা জরুরি বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
এদিকে কয়েকজন অভিভাবক অভিযোগ করেছেন, দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা, ওষুধ ও পুনর্বাসনের ব্যয় বহন করতে গিয়ে তারা আর্থিক সংকটে পড়েছেন। নিহত ও আহতদের পরিবারের দাবি, দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন, দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের দায়িত্ব রাষ্ট্রকে আরও কার্যকরভাবে নিতে হবে।
অন্যদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দুর্ঘটনার পর থেকেই আহত শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারের পাশে থাকার চেষ্টা করা হচ্ছে। চিকিৎসাকালীন সময়ে শিক্ষক ও কর্মীদের হাসপাতালে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল এবং আর্থিক সংকটে থাকা কয়েকটি পরিবারকে প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তাও করা হয়েছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখার কথাও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
এক বছর পেরিয়ে গেলেও মাইলস্টোনের সেই ভয়াবহ দিনের স্মৃতি আজও বহু পরিবারকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। স্বজন হারানোর বেদনা, শারীরিক যন্ত্রণা এবং মানসিক ক্ষত নিয়ে প্রতিটি দিন পার করছেন দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তরা। তাদের প্রত্যাশা, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের পাশাপাশি ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



