প্রকাশিত: আগস্ট ৩০, ২০২৬, ০১:২৫ পিএম
রাজধানীতে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো ‘আয়নাঘর’ থাকবে না। কোনো মা যেন নিখোঁজ সন্তানের অপেক্ষায়, কোনো স্ত্রী যেন স্বামীর ফেরার আশায় বছরের পর বছর চোখের পানি না ফেলেন—এমন একটি রাষ্ট্র গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন তিনি।
রোববার (৩০ আগস্ট) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন রাষ্ট্রপতি।
বক্তব্যের শুরুতে রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে জোরপূর্বক গুমের শিকার ব্যক্তিদের গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করেন। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে স্বজনের সন্ধানে অপেক্ষমাণ পরিবারগুলোর প্রতি সহমর্মিতা জানান। তিনি বলেন, গুমের ঘটনা শুধু একজন মানুষকে নিখোঁজ করে না; এর প্রভাব পড়ে পুরো পরিবারের ওপর। স্বজন হারানোর পাশাপাশি পরিবারগুলোকে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক যন্ত্রণা, অনিশ্চয়তা ও আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
রাষ্ট্রপতি গুমকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এ ধরনের ঘটনা মানুষের জীবন, ব্যক্তিস্বাধীনতা, আইনি সুরক্ষা ও মানবিক মর্যাদার ওপর সরাসরি আঘাত। বাংলাদেশের সংবিধান নাগরিকের এসব অধিকার নিশ্চিত করলেও গুম ও নির্যাতনের মাধ্যমে তা মারাত্মকভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
গত দেড় দশকের ঘটনাপ্রবাহের কথা উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, সে সময় ভিন্নমত পোষণকারী, রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ব্যক্তি, অধিকারকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষকে তুলে নেওয়া, গুম ও গোপনে আটকে রাখার অভিযোগ উঠেছে। অনেক পরিবার বছরের পর বছর তাদের স্বজনের কোনো সন্ধান পায়নি। কেউ কেউ ফিরে এলেও অনেকে এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
গুমের তদন্তে গঠিত কমিশনের প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি জানান, কমিশন এক হাজার ৫৬৯টি ঘটনাকে সুনির্দিষ্টভাবে গুম হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এসব ঘটনার মধ্যে ২৮৭ জনের নিখোঁজ হওয়ার পাশাপাশি মৃত্যুর তথ্যও উঠে এসেছে বলে তিনি জানান।
রাষ্ট্রপতি বলেন, গুমের প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনতে হবে। অপরাধী যত ক্ষমতাবানই হোক, তার পরিচয় বা অবস্থান কোনোভাবেই বিচারের পথে বাধা হতে পারবে না। তবে তিনি প্রতিশোধের পরিবর্তে ন্যায়বিচার ও প্রতিকারের ওপর গুরুত্ব দেন।
তিনি আরও বলেন, গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের দায়িত্বও রাষ্ট্রকে নিতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে স্বজনের অপেক্ষায় থাকা পরিবারগুলোর সামাজিক নিরাপত্তা, চিকিৎসা, শিক্ষা, জীবিকা ও পুনর্বাসনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
রাষ্ট্রপতির ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ সনদে স্বাক্ষর করেছে। গুম ও অন্যান্য গুরুতর অপরাধের বিচার স্বচ্ছতা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে এগিয়ে নেওয়ার কথাও তিনি জানান।
রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও রাজনৈতিক প্রতিহিংসা নয়—এমন একটি বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে রাষ্ট্রপতি বলেন, দেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, কিন্তু ভয়ের পরিবেশ থাকবে না। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা সংবিধান ও আইনের অধীনেই পরিচালিত হবে।
সবশেষে রাষ্ট্রপতি দৃঢ়ভাবে বলেন, স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো ‘আয়নাঘর’ থাকবে না। কোনো পরিবারকে যেন প্রিয়জনের অপেক্ষায় অনিশ্চয়তার জীবন কাটাতে না হয়, সে জন্য রাষ্ট্রকে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। একই সঙ্গে গুমের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের মুখোমুখি করে আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার কথাও পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।



