রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ঢাকায় আরও দুই রুটে মেট্রোরেল, ব্যয় হবে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: আগস্ট ৩০, ২০২৬, ০৪:৪২ পিএম

ঢাকায় আরও দুই রুটে মেট্রোরেল, ব্যয় হবে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা

সংগৃহীত

রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থায় আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ মেট্রোরেল পথ নির্মাণের উদ্যোগ থাকলেও প্রকল্প দুটির ব্যয় নিয়ে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের আলোচনা। প্রাথমিক হিসাবে যে অর্থে কাজ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছিল, সংশোধিত প্রস্তাবে সেই ব্যয় বেড়ে দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। দুই প্রকল্প মিলিয়ে প্রাথমিক ব্যয় ৯৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে এখন ২ লাখ ১৩ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বাড়তি ব্যয়ের এই প্রস্তাব এখন অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

প্রকল্প দুটি হলো কমলাপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত মেট্রোরেল নির্মাণের প্রথম লাইন এবং সাভারের হেমায়েতপুর থেকে গাবতলী, মিরপুর, গুলশান হয়ে ভাটারা পর্যন্ত উত্তরমুখী পঞ্চম লাইন। দুটি পথেই উড়াল ও পাতালপথের সমন্বয়ে মেট্রোরেল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রথম লাইনের একটি অংশ কমলাপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত পাতালপথে যাওয়ার কথা। অন্যদিকে নর্দ্দা থেকে পূর্বাচল অংশটি উড়ালপথে নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

ঢাকার যানজট, জনসংখ্যার চাপ এবং গণপরিবহনের সংকট মোকাবিলায় মেট্রোরেলকে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হিসেবে দেখা হচ্ছে। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় বাড়ার পাশাপাশি ব্যয়ের পরিমাণও দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় এখন অর্থনৈতিক সক্ষমতা, নির্মাণ ব্যয়ের যৌক্তিকতা এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

প্রথম লাইনে ব্যয় বাড়ছে ব্যাপকভাবে

কমলাপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত প্রথম মেট্রোরেল প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা। সংশোধিত প্রকল্প প্রস্তাবে এই ব্যয় ১ লাখ ২০ হাজার ৭৯৪ কোটি টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাৎ আগের হিসাবের তুলনায় প্রায় ৬৮ হাজার কোটি টাকা বেশি ব্যয় হতে পারে।

প্রকল্পটির দৈর্ঘ্য ৩১ কিলোমিটারের বেশি এবং এতে ২১টি স্টেশন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। সংশোধিত ব্যয় অনুমোদিত হলে প্রতি কিলোমিটার মেট্রোরেল নির্মাণে গড়ে প্রায় ৩ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা ব্যয় হওয়ার হিসাব দাঁড়াবে।

এই প্রকল্পকে ঘিরে ইতোমধ্যে কাজও শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের ডিপো উন্নয়নের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং ঠিকাদার নিয়োগের প্রক্রিয়াও এগিয়ে চলছে। তবে পুরো প্রকল্পের ব্যয় পুনর্নির্ধারণের কারণে এখন সংশোধিত প্রস্তাব অনুমোদনের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

উত্তরমুখী মেট্রোরেলেও বড় ব্যয় বৃদ্ধি

সাভারের হেমায়েতপুর থেকে গাবতলী, মিরপুর, গুলশান হয়ে ভাটারা পর্যন্ত উত্তরমুখী পঞ্চম মেট্রোরেল প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ছিল ৪১ হাজার ২৩৯ কোটি টাকা। নতুন প্রস্তাবে সেটি বাড়িয়ে প্রায় ৯৩ হাজার ১৯১ কোটি টাকা করার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ এই প্রকল্পের ব্যয়ও আগের তুলনায় প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা বাড়ছে।

প্রস্তাবিত পথটির দৈর্ঘ্য প্রায় ২০ কিলোমিটার এবং এখানে ১৪টি স্টেশন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন ব্যয় অনুমোদন পেলে প্রতি কিলোমিটার নির্মাণে গড়ে প্রায় ৪ হাজার ৬৬০ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে।

দুটি প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ও সংশোধিত ব্যয়ের তুলনা করলে দেখা যায়, সম্মিলিতভাবে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত অর্থ প্রয়োজন হতে পারে। ফলে প্রকল্প দুটির ব্যয় নিয়ে সরকারি মহল, প্রকৌশলী ও পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে আলোচনা জোরালো হয়েছে।

কেন বাড়ছে প্রকল্পের ব্যয়

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কয়েকটি কারণে প্রকল্প ব্যয় বেড়েছে। ২০১৯ সালে প্রকল্প দুটির প্রাথমিক হিসাব তৈরির সময় বিস্তারিত নকশা পুরোপুরি চূড়ান্ত হয়নি। পরবর্তী সময়ে বিস্তারিত নকশা তৈরির সময় বিভিন্ন পরিবর্তন আসে। এর ফলে নির্মাণকাজের পরিধিও কিছুটা বেড়েছে।

এর পাশাপাশি গত কয়েক বছরে নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়েছে। সিমেন্ট, ইস্পাত, জ্বালানি, বিটুমিন, যন্ত্রপাতি ও পরিবহন ব্যয়ের বৃদ্ধি সরাসরি প্রকল্পের মোট খরচে প্রভাব ফেলেছে। মূল্যস্ফীতিও ব্যয় বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে।

আরেকটি বড় বিষয় হলো বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময়মূল্যের পরিবর্তন। প্রকল্পের প্রাথমিক হিসাবের সময় এক মার্কিন ডলারের বিপরীতে প্রায় ৮৪ টাকা ৫০ পয়সা ধরা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে এই হিসাব বেড়ে প্রায় ১২২ টাকা হয়েছে। ফলে বিদেশ থেকে আমদানি করা যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য সরঞ্জামের জন্য একই পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হলেও স্থানীয় মুদ্রায় তার মূল্য অনেক বেড়ে গেছে।

এ ছাড়া কর ও মূল্য সংযোজন কর, জমি অধিগ্রহণ, বিভিন্ন সেবা সংস্থার অবকাঠামো সরানো, পরামর্শক ব্যয়, নির্মাণকালীন সুদ এবং সম্ভাব্য অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যয়ও সংশোধিত প্রস্তাবে যুক্ত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

কারিগরি কমিটির পর্যালোচনা

দুই প্রকল্পের ব্যয় এত বড় অঙ্কে বাড়ানোর বিষয়টি যাচাই করতে সাত সদস্যের একটি কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের সাবেক অধ্যাপক শামীম জেড বসুনিয়ার নেতৃত্বে গঠিত কমিটি প্রকল্পের বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করে প্রতিবেদন দেয়।

কমিটির প্রতিবেদনে বাড়তি ব্যয়ের বিষয়টিকে যৌক্তিক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময়মূল্য বৃদ্ধি, নকশার পরিবর্তন, কর ও মূল্য সংযোজন করসহ বিভিন্ন কারণে প্রকল্পের ব্যয় বাড়তে পারে বলে কমিটি মত দিয়েছে। এরপরই সংশ্লিষ্ট বাস্তবায়নকারী সংস্থা সংশোধিত প্রকল্প প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে।

তবে কারিগরি কমিটির ব্যয় বৃদ্ধির যৌক্তিকতা মেনে নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্নও রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করছে, ব্যয় বাড়ার পেছনে বাস্তব কারণ থাকলেও দ্বিগুণের বেশি বৃদ্ধি যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র নিয়ে প্রশ্ন

মেট্রোরেল প্রকল্পের ব্যয় নিয়ে আলোচনায় দরপত্র ব্যবস্থার বিষয়টিও সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের বক্তব্য অনুযায়ী, ঋণদাতা সংস্থার কিছু শর্তের কারণে ঠিকাদার নিয়োগে প্রতিযোগিতার সুযোগ সীমিত হতে পারে। প্রতিযোগিতা কম থাকলে দরপত্রে কম মূল্যে কাজ পাওয়ার সম্ভাবনাও কমে যায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্পে উন্মুক্ত ও কার্যকর প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা গেলে নির্মাণ ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে প্রকল্পের নকশা, কাজের পরিধি এবং প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি নির্ধারণের ক্ষেত্রেও ব্যয় সাশ্রয়ের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা দরকার।

কারিগরি পরিবর্তন ও বৈদেশিক মুদ্রার কারণে ব্যয় কিছুটা বাড়তেই পারে—এটি স্বাভাবিক। কিন্তু সেই বৃদ্ধির পরিমাণ কতটা যৌক্তিক, তা নির্ধারণে প্রতিটি খাত আলাদাভাবে পরীক্ষা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

জাপানি ঋণে নির্মাণ

প্রকল্প দুটি বাস্তবায়নে অর্থায়ন করছে জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা জাইকা। ফলে প্রকল্পের অর্থায়ন কাঠামোর সঙ্গে ঋণদাতা সংস্থার শর্তও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে জাইকার সঙ্গে প্রকল্পের ব্যয় কমানো ও বাস্তবায়ন কাঠামো নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

অন্যদিকে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে যত দেরি হবে, ততই নির্মাণসামগ্রীর দাম, শ্রম ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার মূল্য এবং অন্যান্য খরচ বাড়তে পারে। ফলে এখন প্রকল্প স্থগিত বা দীর্ঘ সময় পিছিয়ে দিলে ভবিষ্যতে ব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

যানজট কমাতে মেট্রোরেলের প্রয়োজনীয়তা

ঢাকার সড়কে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ চলাচল করেন। যানজটের কারণে কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি জ্বালানি খরচ ও পরিবেশদূষণও বাড়ছে। দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে মেট্রোরেল তাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর বক্তব্যও একই দিকে ইঙ্গিত করে। তাঁর মতে, ঢাকার যানজট ও পরিবহন সংকট মোকাবিলায় মেট্রোরেলের প্রয়োজন রয়েছে। তবে প্রয়োজনীয়তা থাকলেও প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয়ের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি।

একদিকে মেট্রোরেল নির্মাণের মাধ্যমে রাজধানীর যোগাযোগব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনার প্রত্যাশা রয়েছে, অন্যদিকে এত বড় অঙ্কের ব্যয় নিয়ে সাধারণ মানুষের অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার প্রশ্নও রয়েছে। তাই প্রকল্প অনুমোদনের আগে ব্যয়ের প্রতিটি খাত যাচাই করা এবং যেখানে ব্যয় কমানোর সুযোগ আছে, সেখানে তা কাজে লাগানো গুরুত্বপূর্ণ।

এখন সিদ্ধান্ত পরিকল্পনা কমিশনের

সংশোধিত প্রকল্প প্রস্তাব ইতোমধ্যে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। সেখানে প্রকল্পের বাড়তি ব্যয়, নকশার পরিবর্তন, নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময়মূল্য এবং অন্যান্য খরচ পর্যালোচনা করা হবে। মূল্যায়ন শেষে সংশোধিত ব্যয় অনুমোদনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

অর্থাৎ ২ লাখ ১৩ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা এখনো চূড়ান্ত ব্যয় নয়; এটি সংশোধিত প্রস্তাবের অঙ্ক। অনুমোদনের সময় ব্যয়ের কোনো খাতে পরিবর্তন আসতে পারে। তবে প্রস্তাবিত অঙ্ক অনুমোদিত হলে ঢাকার এই দুই মেট্রোরেল প্রকল্প দেশের অন্যতম ব্যয়বহুল অবকাঠামো উদ্যোগে পরিণত হবে।

রাজধানীর যানজট কমাতে আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে খুব বেশি দ্বিমত নেই। মূল প্রশ্ন এখন—এই প্রয়োজনীয় অবকাঠামো কতটা সাশ্রয়ী, স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলকভাবে নির্মাণ করা যায়। মেট্রোরেল বাস্তবায়নের পাশাপাশি সরকারি অর্থের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

মাতৃভূমির খবর

Advertisement
Advertisement
Link copied!