রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বেসরকারি সাবমেরিন কেবল নিয়ে সরকারের কঠোর অবস্থান

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৯, ২০২৬, ০৯:৫৬ এএম

বেসরকারি সাবমেরিন কেবল নিয়ে সরকারের কঠোর অবস্থান

ফাইল ছবি

বেসরকারি খাতে সাবমেরিন কেবল স্থাপনের উদ্যোগে নতুন করে জটিলতা তৈরি হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করতে না পারায় তিন লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানকে আরও এক বছর সময় দেওয়ার সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন। তবে জাতীয় নিরাপত্তা, লাইসেন্সের শর্ত লঙ্ঘন এবং প্রকল্পে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতাসহ নানা বিষয়ে সরকারের কঠোর অবস্থানের কারণে কেবল স্থাপনের অনুমোদন এখনো অনিশ্চিত।

২০২২ সালে দেশে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ আমদানির সক্ষমতা বাড়াতে বেসরকারি খাতের তিন প্রতিষ্ঠান—সামিট কমিউনিকেশনস, মেটাকোর সাবকম ও সিডিনেট কমিউনিকেশনসকে সাবমেরিন কেবল স্থাপনের পৃথক লাইসেন্স দেওয়া হয়। লাইসেন্সের শর্ত অনুযায়ী, অনুমোদন পাওয়ার পর ৪৮ মাসের মধ্যে কেবল স্থাপন শেষ করে গ্রাহক পর্যায়ে বাণিজ্যিক সেবা দেওয়ার উপযোগী হওয়ার বাধ্যবাধকতা ছিল।

নির্ধারিত সময়সীমা অনুযায়ী সামিট কমিউনিকেশনস ও সিডিনেট কমিউনিকেশনসের কার্যক্রম শুরুর সময় শেষ হয়েছে গত ৩১ আগস্ট। অন্যদিকে মেটাকোর সাবকমের সময়সীমা শেষ হওয়ার কথা ১৩ সেপ্টেম্বর। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে না পারায় সিডিনেট ও সামিট ১৮ মাস এবং মেটাকোর ২৪ মাস সময় বাড়ানোর আবেদন করে।

তবে প্রতিষ্ঠানগুলোর আবেদনের পরিমাণ অনুযায়ী নয়, তিন প্রতিষ্ঠানকে এক বছর অতিরিক্ত সময় দেওয়ার সুপারিশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত কমিশনের ৩১০তম সভায় এ বিষয়ে আলোচনা হয়। কমিশনের পক্ষ থেকে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে সুপারিশ পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

কমিশনের আলোচনায় উঠে আসে, প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় কেবলবাহী জাহাজ বাংলাদেশে প্রবেশের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছিল। কেবল স্থাপনকারী জাহাজ ও এর কর্মীদের বাংলাদেশের জলসীমায় প্রবেশ এবং সমুদ্রের তলদেশে কেবল বসানোর জন্য বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের অনুমোদনও নেওয়া হয়। প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, মৎস্য ও নৌপরিবহনসহ কয়েকটি সংশ্লিষ্ট দপ্তর প্রয়োজনীয় অনুমোদন দিলেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র না পাওয়ায় নির্ধারিত সময়ে কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি।

এর পাশাপাশি আবহাওয়া ও সমুদ্রের ভৌগোলিক পরিস্থিতিও প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সূচিতে প্রভাব ফেলেছে। সমুদ্রের তলদেশে কেবল স্থাপনের জন্য নির্দিষ্ট মৌসুমকে উপযোগী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে অনুমোদন পেতে দেরি হলে পরবর্তী সুযোগ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। এসব বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে কমিশন মনে করছে, নির্ধারিত ৪৮ মাসের মধ্যে প্রকল্পের কার্যক্রম শেষ করা প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে সম্ভব হয়নি।

এদিকে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কার্যক্রম শুরু করতে না পারলে লাইসেন্সের শর্ত অনুযায়ী পারফরম্যান্স ব্যাংক গ্যারান্টি থেকে প্রতি মাসে নির্দিষ্ট হারে অর্থ কেটে নেওয়ার বিধান রয়েছে। দীর্ঘ সময় বিলম্ব হলে শেষ পর্যন্ত লাইসেন্স বাতিলেরও সুযোগ রয়েছে। তাই সময় বাড়ানোর আবেদনকে প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য আর্থিক ক্ষতি ও লাইসেন্স বাতিলের ঝুঁকি এড়ানোর গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক অনুমোদন ঘিরে। ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোকে জানিয়েছে, তাদের অনুমোদন ছাড়া বেসরকারি সাবমেরিন কেবল প্রকল্পে জাহাজ প্রবেশ কিংবা কেবল স্থাপনের জন্য কোনো ছাড়পত্র দেওয়া যাবে না।

এর পেছনে লাইসেন্সের শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগও রয়েছে। তিন প্রতিষ্ঠান পৃথক লাইসেন্স পেলেও পরবর্তী সময়ে তারা যৌথভাবে একটি উদ্যোগ গড়ে কেবল স্থাপনের কাজ এগিয়ে নেয়। অভিযোগ রয়েছে, এ ধরনের যৌথ উদ্যোগ গঠনের আগে প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন নেওয়া হয়নি।

প্রকল্পের প্রধান ঠিকাদারি কার্যক্রমে চীনা প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা নিয়েও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আপত্তি তৈরি হয়েছে। ফলে জাতীয় নিরাপত্তা, ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সাবমেরিন কেবল প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক স্বার্থ—সবকিছু মিলিয়ে প্রকল্পটি নিয়ে সরকারের মধ্যে সতর্কতা বাড়ছে।

এ অবস্থায় গত ২৯ জুলাই সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সরকারি দপ্তর ও নিরাপত্তা সংস্থাকে চিঠি দিয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ তাদের অনুমতি ছাড়া প্রকল্পের বিষয়ে কোনো ছাড়পত্র না দেওয়ার অনুরোধ জানায়। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ, ব্যবসায়িক স্বার্থ এবং জাতীয় নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনায় নেওয়ার কথাও জানানো হয়।

অন্যদিকে, তিন প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স কীভাবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় দেওয়া হয়েছিল, তা নিয়েও সরকারের উচ্চপর্যায়ে প্রশ্ন উঠেছে। লাইসেন্স প্রদানের প্রক্রিয়া ও মালিকানাসংক্রান্ত বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

সব মিলিয়ে একদিকে বেসরকারি সাবমেরিন কেবল প্রকল্পের কাজ দ্রুত শেষ করতে সময় বাড়ানোর সুপারিশ, অন্যদিকে নিরাপত্তা ও অনুমোদন নিয়ে সরকারের কঠোর অবস্থান—দুই বিপরীত অবস্থানের মধ্যে প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তায় পড়েছে। বর্তমানে কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে বিষয়টি।

দেশে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। বর্তমানে দেশের আন্তর্জাতিক সংযোগের বড় অংশ সরকারি মালিকানাধীন দুটি সাবমেরিন কেবলের ওপর নির্ভরশীল। ফলে নতুন সাবমেরিন কেবল যুক্ত না হলে ভবিষ্যতে ব্যান্ডউইথের চাহিদা মেটানো এবং আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট সংযোগে ঝুঁকি কমানো কঠিন হতে পারে। এ কারণে নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক জটিলতার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে দেশের ডিজিটাল অবকাঠামোর প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখার দাবি উঠছে।

মাতৃভূমির খবর

Advertisement
Advertisement
Link copied!