জীবন সালেহিন
প্রকাশিত: অক্টোবর ৩০, ২০২৫, ০৬:৪০ পিএম
বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গন এক সময় ছিল নৈতিকতা, শ্রদ্ধা ও মানবতার চর্চার স্থান। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই পরিসর উদ্বেগজনকভাবে বিভাজন, বিদ্বেষ ও ধর্ম অবমাননার ঘটনায় কলুষিত হচ্ছে। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি থেকে শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি কিংবা শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়— প্রায় প্রতিটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একের পর এক ধর্মীয় কটূক্তি, কুরআন অবমাননা ও ইসলাম বিদ্বেষের ঘটনা ঘটছে। এমনকি স্কুল পর্যায়েও এর প্রভাব পড়ছে।
এই প্রবণতা নিছক বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং এটি আমাদের সমাজ, শিক্ষা ও নৈতিক কাঠামোর গভীর এক অবক্ষয়ের বহিঃপ্রকাশ। ধর্মীয় অবমাননা ও কটূক্তির পেছনে একাধিক স্তরে কারণ রয়েছে।
শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিকতার ঘাটতি সবচেয়ে বড় কারণ। আমাদের পাঠ্যক্রম এমনভাবে সাজানো হয়েছে যেখানে ধর্মীয় জ্ঞান, সহনশীলতা বা নৈতিক চেতনা শেখানোর কোনো স্থান নেই। ইসলাম, নৈতিক শিক্ষা বা তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব বিষয়গুলো ক্রমে অবহেলিত বা সংকুচিত হয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীরা ধর্ম সম্পর্কে জ্ঞান না পেয়ে কেবল বিদ্রূপ বা বিকৃত ধারণা নিয়েই বড় হচ্ছে।
ডিজিটাল সংস্কৃতির অপব্যবহারও এ প্রবণতাকে বাড়িয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে অনেকে ভুলভাবে ব্যবহার করছে। তারা অনেকেই জ্ঞানের পরিমিতি ছাড়াই ধর্ম নিয়ে ব্যঙ্গ করছে— যা অজান্তেই অন্যের বিশ্বাসে আঘাত করছে এবং সমাজে বিভাজন তৈরি করছে।
শিক্ষাঙ্গনের প্রশাসনিক নীরবতাও এ অবক্ষয়কে গভীর করেছে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় এমন ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন শৃঙ্খলাভঙ্গ হিসেবে দেখে, কিন্তু তা সমাজে কী ভয়াবহ বার্তা দিচ্ছে, তা উপলব্ধি করে না। ফলে প্রতিবার শাস্তি বিলম্বিত হয়, আর অপরাধীরা আরও সাহস পায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধর্মবিদ্বেষী প্রবণতা মূলত পশ্চিমা ইসলামোফোবিয়ার এক প্রতিচ্ছবি, যা ৯/১১ ঘটনার পর পশ্চিমা জগতে ছড়ানো হয় এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনেও প্রবেশ করে। অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ তাজাম্মুল হকের মতে, স্বৈরাচারী ১৫ বছরের শাসনামলে শিক্ষা ব্যবস্থায় ইসলামোফোবিয়া ও ধর্মবিদ্বেষের চর্চা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়। এর ফলে তরুণ প্রজন্মের একাংশ নিজেদের সংস্কৃতি ও বিশ্বাস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
এই সংকটের দায় কেবল শিক্ষার্থীর নয়— পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র— তিনটি স্তরই দায়ী। পরিবারে ধর্মীয় আদব ও নৈতিক শিক্ষা হারিয়ে গেছে, শিক্ষকরা একাডেমিক পাঠে সীমাবদ্ধ, আর রাষ্ট্র মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষাকে প্রায় অপ্রাসঙ্গিক করে ফেলেছে।
আইনি দিক থেকেও পদক্ষেপ দুর্বল। ধর্ম অবমাননার ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দ্রুত ‘সাসপেনশন’ বা ‘বহিষ্কার’ করে, কিন্তু বিচারিক বা আইনি কাঠামো এখনো কার্যকর নয়। দৃশ্যমান শাস্তি না থাকায় এই প্রবণতা থামছে না। বরং অপরাধীরা মনে করে— এর কোনো পরিণতি নেই।
এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে শিক্ষা ব্যবস্থায় মূল্যবোধ ও নৈতিকতার চর্চা ফিরিয়ে আনতে হবে। কারিকুলামে আদব, নৈতিকতা ও ধর্মীয় সহনশীলতা পুনঃপ্রবর্তন করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও নৈতিক নেতৃত্ববিষয়ক উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। অনলাইন স্পেসে ধর্মবিদ্বেষী বক্তব্যের বিরুদ্ধে কঠোর মনিটরিং এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
আমাদের শিক্ষার লক্ষ্য শুধু ডিগ্রি বা চাকরি নয়, বরং এমন মানুষ গড়ে তোলা যারা আল্লাহর প্রতি দায়বদ্ধ, সমাজের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও মানবতার প্রতি সহনশীল। শিক্ষাঙ্গনে ধর্ম অবমাননার এই প্রবণতা আমাদের জানিয়ে দিচ্ছে— নৈতিক শূন্যতার এই অন্ধকার থেকে ফিরে আসা জরুরি।
যদি আমরা এখনই শিক্ষায় ঈমান, আদব, শ্রদ্ধা ও মানবতার চর্চা ফিরিয়ে না আনতে পারি, তাহলে ডিগ্রিধারী মানুষ বাড়বে, কিন্তু মানুষ হারিয়ে যাবে।
ধর্মকে নয়, অন্ধতা ও অহংকারকেই প্রশ্নবিদ্ধ করতে হবে— তবেই শিক্ষার আলোক আবার ফিরে আসবে।
লেখক: গবেষক ও সামাজিক চিন্তক
মাতৃভূমির খবর