রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

জুলাই গণঅভ্যুত্থান: দুই বছর পর প্রত্যাশা, প্রাপ্তি ও বাংলাদেশের নতুন বাস্তবতা

মোতাহের উদ্দিন

প্রকাশিত: আগস্ট ৫, ২০২৬, ১১:২৪ এএম

জুলাই গণঅভ্যুত্থান: দুই বছর পর প্রত্যাশা, প্রাপ্তি ও বাংলাদেশের নতুন বাস্তবতা

ছবি: প্রতিনিধি

দুই বছর আগে জুলাইয়ের উত্তাল দিনগুলো শুধু একটি সরকার পরিবর্তনের ইতিহাস রচনা করেনি বরং রাষ্ট্র, রাজনীতি ও নাগরিক প্রত্যাশার নতুন বাস্তবতাও তৈরি করেছিল। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন অল্প সময়ের মধ্যেই রূপ নেয় গণঅভ্যুত্থানে। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, শ্রমজীবী মানুষ, পেশাজীবী ও সাধারণ নাগরিকের অংশগ্রহণে গড়ে ওঠা এ আন্দোলন রাষ্ট্রে জবাবদিহিতা, গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিকে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে। দুই বছর পরও সেই আন্দোলনের প্রভাব বাংলাদেশের রাজনীতি, রাষ্ট্র সংস্কার ও নাগরিক প্রত্যাশায় স্পষ্ট।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট

২০২৪ সালের ৫ জুন সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিলসংক্রান্ত ২০১৮ সালের পরিপত্রের কার্যকারিতা বাতিল করে হাইকোর্ট। এর ফলে কোটা ব্যবস্থা পুনর্বহালের সম্ভাবনা তৈরি হলে শিক্ষার্থীরা মেধাভিত্তিক নিয়োগের দাবিতে আন্দোলনে নামেন। শুরুতে আন্দোলনটি কোটা সংস্কারের দাবিতে সীমাবদ্ধ থাকলেও দমন-পীড়ন, প্রাণহানি এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অসন্তোষের কারণে এটি রাষ্ট্র সংস্কার, ভোটাধিকার, জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা ও গণতান্ত্রিক অধিকারের দাবিতে সর্বস্তরের মানুষের গণআন্দোলনে পরিণত হয়।

৫ আগস্ট: নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সূচনা

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ঘোষিত ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির দিন কারফিউ উপেক্ষা করে হাজার হাজার মানুষ রাজধানীতে সমবেত হন। দুপুরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়লে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আসে। এর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র সংস্কার, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন এবং জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে নতুন জাতীয় আলোচনার সূচনা হয়।

কেন এই আন্দোলন ব্যতিক্রম

বাংলাদেশের অন্যান্য গণআন্দোলনের তুলনায় জুলাই গণঅভ্যুত্থান কয়েকটি কারণে আলাদা। একটি নির্দিষ্ট দাবিকে কেন্দ্র করে শুরু হলেও এটি দ্রুত রাষ্ট্রব্যবস্থা ও গণতান্ত্রিক অধিকারের বৃহত্তর আন্দোলনে রূপ নেয়। তরুণদের নেতৃত্ব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কার্যকর ব্যবহার এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ আন্দোলনকে জাতীয় রূপ দেয়। একই সঙ্গে এটি রাষ্ট্র সংস্কার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ নিয়ে নতুন বিতর্কের ভিত্তি তৈরি করে।

দুই বছর পর: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

দুই বছরে রাষ্ট্র সংস্কার ও জবাবদিহিতার প্রশ্নটি জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের উদ্যোগ এবং বিভিন্ন ঘটনার বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সংবিধান, নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন ও স্থানীয় সরকার সংস্কারের লক্ষ্যে কমিশন গঠন এবং বিভিন্ন নীতিগত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তবে আন্দোলনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাশা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। সংবিধানের মৌলিক সংস্কার, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (PR), নির্বাচন কমিশনের পূর্ণাঙ্গ সংস্কার, বিচার বিভাগের কার্যকর স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মতো বিষয়গুলো এখনো অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। ফলে রাজনৈতিক পরিবর্তন এলেও কাঠামোগত সংস্কার এখনো চলমান।

অর্থনীতি ও সমাজে প্রভাব

গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে শিল্প উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য, রপ্তানি ও বিনিয়োগে সাময়িক প্রভাব পড়ে। পরবর্তীতে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।

সামাজিক ক্ষেত্রে তরুণদের মধ্যে গণতন্ত্র, সংবিধান, মানবাধিকার ও রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে সচেতনতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নাগরিক অংশগ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্মে পরিণত হলেও রাজনৈতিক মেরুকরণও কিছু ক্ষেত্রে বৃদ্ধি পেয়েছে।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

জুলাই গণঅভ্যুত্থান আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়। জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশ সহিংসতা বন্ধ, মানবাধিকার রক্ষা এবং নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানায়। পরবর্তীতে বাংলাদেশের সংস্কার প্রক্রিয়া, আইনের শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর আন্তর্জাতিক মহল গুরুত্ব দেয়।

সামনে যে চ্যালেঞ্জ

যেকোনো গণঅভ্যুত্থানের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কতটা শক্তিশালী হলো এবং আইনের শাসন কতটা প্রতিষ্ঠিত হলো তার ওপর। বর্তমানে বাংলাদেশের সামনে রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সব ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

রাজনৈতিকভাবে জাতীয় ঐকমত্য, অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। প্রশাসনিকভাবে জনপ্রশাসন, পুলিশ ও বিচার বিভাগকে আরও দক্ষ, নিরপেক্ষ ও জনমুখী করতে হবে। পাশাপাশি দুর্নীতি দমন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা সময়ের অন্যতম দাবি।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ জরুরি। একই সঙ্গে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি ও গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে হবে।


বিশ্লেষকদের মতে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো তরুণদের মধ্যে নাগরিক দায়িত্ববোধ, রাজনৈতিক সচেতনতা এবং রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে আগ্রহ বৃদ্ধি। এই আন্দোলন দেখিয়েছে যে গণতন্ত্র শুধু নির্বাচননির্ভর নয় বরং জবাবদিহি, সুশাসন, মানবাধিকার এবং শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভিত্তি।

দুই বছর পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় পরিবর্তন এসেছে এবং রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে জাতীয় আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে। তবে একটি জবাবদিহিমূলক, ন্যায়ভিত্তিক ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য এখনো পূর্ণ হয়নি। তাই জুলাই গণঅভ্যুত্থান শুধু অতীতের একটি ঘটনা নয়; এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নির্মাণের একটি চলমান অঙ্গীকার।

মাতৃভূমির খবর

Advertisement
Advertisement
Link copied!