রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

নারী শিক্ষার অগ্রদূত: খালেদা জিয়ার যুগান্তকারী অবদান

মনিকা সোহাগ

প্রকাশিত: জানুয়ারি ১, ২০২৬, ০৮:২৫ পিএম

নারী শিক্ষার অগ্রদূত: খালেদা জিয়ার যুগান্তকারী অবদান

খালেদা জিয়াঃ ফাইল ছবি

বাংলাদেশের নারী শিক্ষার ইতিহাসে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অবদান এক উজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত। নারী শিক্ষাকে মূলধারায় নিয়ে আসা এবং এর ব্যাপক প্রসারে তিনি যে দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন, তা এই জনপদ যুগে যুগে স্মরণ রাখবে। তাঁর নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো কেবল সমসাময়িক সময়েই প্রশংসিত হয়নি, বরং তা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক কাঠামোর ভিত্তি গড়ে দিয়েছে।

বেগম খালেদা জিয়ার সবচেয়ে বৈপ্লবিক ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ ছিল নারী শিক্ষার্থীদের জন্য অবৈতনিক শিক্ষা ও উপবৃত্তি চালু করা। তিনিই প্রথম চিন্তা করেছিলেন যে, মেয়েদের স্কুলে ধরে রাখতে হলে কেবল বিনা বেতনে পড়ালেই চলবে না, তাদের হাতে উপবৃত্তি তুলে দিতে হবে। এই উপবৃত্তি কার্যক্রম তিনি ধাপে ধাপে প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত করেন। বিষয়টি তখন অনেকের কাছেই অকল্পনীয় ছিল। এমনকি বিশ্বব্যাংকের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাও শুরুতে এই উদ্যোগকে সন্দেহের চোখে দেখেছিল। সম্পূর্ণ সরকারি খরচে, বিদেশি অনুদান ছাড়া এত বড় একটি প্রকল্প কীভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব—তা নিয়ে অনেকেই সংশয় প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু বেগম জিয়া ছিলেন অটল। তিনি সাহসিকতার সাথে এই প্রকল্প এগিয়ে নিয়ে যান এবং সফল হন।

মজার বিষয় হলো, পরবর্তীতে বিশ্বব্যাংকসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই উপবৃত্তি প্রকল্পকেই 'মডেল' হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে নারী শিক্ষার উন্নয়নে এটি এখন একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। এই প্রকল্পের সাফল্য এতটাই সুদূরপ্রসারী ছিল যে, পরবর্তী সময়ে সরকার পরিবর্তন হলেও কেউ এই কার্যক্রম বন্ধ করতে পারেনি। বেগম জিয়ার অনেক নীতি বা কৌশল পরবর্তী সরকারগুলো বাতিল করলেও, নারী শিক্ষার এই ভিত্তি তারা ফেলতে পারেনি; বরং তা আরও সম্প্রসারিত হয়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, একজন নারী যদি অন্তত অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন, তবে তার সন্তান কখনোই নিরক্ষর থাকে না এবং অপুষ্টিতে ভোগে না। ইউএনএফপিএ (UNFPA)-এর গবেষণাতেও বিষয়টি উঠে এসেছে। খালেদা জিয়ার উপবৃত্তি ও অবৈতনিক শিক্ষা কার্যক্রমের প্রত্যক্ষ ফসল আজকের বাংলাদেশ। আজ যে আমরা পোশাক শিল্পে লাখো নারীর কর্মসংস্থান দেখছি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হিসেবে নারীদের স্বাবলম্বী হতে দেখছি কিংবা কৃষিকাজে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে—তার মূলে রয়েছে সেই সময়ের নেওয়া শিক্ষার উদ্যোগ। শিক্ষার আলো পেয়ে নারীরা ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে, যা দেশের অর্থনীতিতে বিশাল অবদান রাখছে।

নারীর ক্ষমতায়নের প্রসঙ্গ এলে বেগম খালেদা জিয়া নিজেই এক বড় উদাহরণ। প্রচলিত কথায় বলা যায়, ‘ফ্রম দ্য হাউস টু দ্য লিডার অব দ্য পার্লামেন্ট’—অর্থাৎ গৃহবধূ থেকে তিনি হয়ে উঠেছেন সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী। তিনি যখন রাজনীতির মাঠে নামেন, তখন তিনি নিজেই একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হন। তাঁর এই পথচলা অসংখ্য নারীকে রাজনীতিতে আসতে উদ্বুদ্ধ করেছে। নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন সমাজের সব ধরনের ক্ষমতায়নের (শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সমাজকল্যাণ) মূল চালিকাশক্তি। খালেদা জিয়া সেই জায়গায় একজন ‘রোল মডেল’ বা অনুকরণীয় আদর্শ হয়ে উঠেছেন।

প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে তিনি কীভাবে অনুপ্রেরণা জুগিয়ে চলেছেন, তার একটি ছোট্ট উদাহরণ দেওয়া যাক। গত বছরের ৫ আগস্টের পর সিলেটের এক প্রত্যন্ত গ্রামে আমার একটি অভিজ্ঞতার কথা মনে পড়ছে। অজপাড়াগাঁয়ের চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ুয়া এক শ্রমজীবী শিশুকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, "বড় হয়ে তুমি কী হতে চাও?" শিশুটি কোনো দ্বিধা ছাড়াই উত্তর দিয়েছিল, "প্রধানমন্ত্রী"। আমি হেসে বলেছিলাম, "তুমি কি হতে পারবে?" শিশুটির পাল্টা প্রশ্ন ছিল, "কেন পারব না? খালেদা জিয়া যদি হতে পারেন, আমি পারব না কেন?"

এটাই হলো প্রকৃত নেতৃত্বের প্রভাব। তিনি কেবল নীতি প্রণয়ন করেননি, বরং অজপাড়াগাঁয়ের একটি ছোট্ট মেয়ের মনেও স্বপ্ন বুনতে শিখিয়েছেন। একজন নেতা যখন সাধারণ মানুষের স্বপ্নের মডেলে পরিণত হন, তখনই তিনি ইতিহাসে স্থায়ী আসন করে নেন। খালেদা জিয়ার প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা বাংলাদেশকে নারী শিক্ষায় ও ক্ষমতায়নে যে উচ্চতায় নিয়ে গেছে, নতুন প্রজন্ম তা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে।

মাতৃভূমির খবর

Advertisement
Advertisement
Link copied!