মনিকা সোহাগ
প্রকাশিত: ডিসেম্বর ৩০, ২০২৫, ০৩:০৯ পিএম
ইতিহাসের পাতায় কিছু কিছু নাম কেবল ব্যক্তিপরিচয়ে সীমাবদ্ধ থাকে না, হয়ে ওঠে একটি সময়ের, একটি প্রজন্মের সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন তেমনই এক নাম—যিনি আমাদের প্রজন্মের জন্য ছিলেন রাজনৈতিক অন্ধকারের মাঝে আলোর দিশারী। তাঁর কণ্ঠস্বরেই ধ্বনিত হতো এ দেশের সাধারণ মানুষের মনের গহিনে লুকিয়ে থাকা সার্বভৌমত্বের আকাঙ্ক্ষা, যা ছিল একইসঙ্গে সরল ও অত্যন্ত শক্তিশালী।
১৯৯১ সালের সেই ঐতিহাসিক নির্বাচনের কথা মনে পড়ে। নির্বাচনের ঠিক আগের দিন শেষ জনসভায় তাঁর একটি উক্তি পরদিন সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়ে কাঁপিয়ে দিয়েছিল পুরো দেশ— “ওদের হাতে গোলামীর জিঞ্জির, আমাদের হাতে স্বাধীনতার পতাকা।” এই একটি বাক্য কেবল রাজনৈতিক স্লোগান ছিল না; এটি ছিল বাংলাদেশের মানুষের সম্মিলিত ভয় ও স্বপ্নের এক নিখুঁত বয়ান। দেশের অন্য কোনো রাজনৈতিক নেতা জাতির এই মনস্তত্ত্বকে এতটা গভীরভাবে, এতটা সহজ ভাষায় প্রকাশ করতে পারেননি।
আমাদের জাতীয় মানসে একটি সুপ্ত ভীতি সবসময় কাজ করেছে—ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের ভয়। মিথিক্যাল ‘অখণ্ড ভারত’-এর অংশ হয়ে যাওয়ার সেই শঙ্কা, তা আক্ষরিক অর্থে হোক বা প্রভাবের দিক থেকে—বেগম জিয়া তা অনুধাবন করেছিলেন। শেখ হাসিনার বিগত শাসনামলে জাতি সেই আশঙ্কারই এক ‘ড্রেস রিহার্সাল’ প্রত্যক্ষ করেছে। আর ঠিক এই জায়গাতেই খালেদা জিয়া ছিলেন পাহাড়ের মতো অটল। তাঁর রাজনৈতিক দৃষ্টির স্বচ্ছতা ছিল বিএনপির প্রধান শক্তি। সময়ের হাজারো ঝড়েও তিনি সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে ছিলেন আপসহীন, অবিচল।
তবে ইতিহাসের নির্মম সত্য হলো, তাঁর নিজের দল সম্ভবত কখনোই তাঁর এই ইস্পাতকঠিন নেতৃত্বের যোগ্য হয়ে উঠতে পারেনি। ক্ষমতালোভী আমলাতন্ত্র, অলিগার্ক আর সুবিধাবাদীদের ভিড়ে তাঁর দল কলুষিত হয়েছে বারবার। তারা বেগম জিয়ার আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা, সততা আর বলিষ্ঠতাকে ব্যবহার করেছে কেবল ক্ষমতার সিঁড়ি হিসেবে। নির্মম বাস্তবতা হলো, তিনি রাজনীতির দৃশ্যপট থেকে সরে দাঁড়ানোর সাথে সাথেই তাঁর দল সেই ‘অখণ্ড ভারতবাদী’ প্রভাবের কাছে অনেকটা আত্মসমর্পণ করেছে। একসময় যাঁর নাম শুনলে আধিপত্যবাদী শক্তি অস্বস্তিতে ভুগত, আজ তারা তাঁর অবর্তমানে দলের নেতৃত্বে স্বস্তি খুঁজে পায়—এটাই কি তাঁর আপসহীনতার প্রতি দলের প্রতিদান?
তবুও, ব্যক্তি বা দলের বিচ্যুতি তাঁর উচ্চতাকে ম্লান করতে পারবে না। খালেদা জিয়া আমাদের রাজনৈতিক আকাশের ধ্রুবতারা হয়েই জ্বলবেন। যখনই জাতি পথ হারাবে, যখনই সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়বে, আমরা ফিরে তাকাবো তাঁর আদর্শের দিকে। রাজনৈতিক দিকভ্রান্তির সময়ে তাঁর অটলতাই হবে আমাদের পাথেয়।
আজকের এই বিদায় কেবল অশ্রু দিয়ে নয়, বরং বুকভরা গর্ব নিয়ে জানাতে হয়। কারণ আমরা বিদায় জানাচ্ছি আমাদের তারুণ্যের ‘কমান্ডার’কে। তিনি শিখিয়ে গেছেন কীভাবে মেরুদণ্ড সোজা রেখে দাঁড়াতে হয়।
অসীমের পথে আপনার অনন্ত যাত্রা শুভ হোক, কমান্ডার। বাংলাদেশ আপনাকে মনে রাখবে তার স্বাধীনতার পতাকাবাহী হিসেবে।
মাতৃভূমির খবর