জে আই জাহিদ
প্রকাশিত: জুলাই ১৩, ২০২৬, ০৪:১৫ পিএম
ছবি: প্রতিনিধি
বাংলাদেশ স্বাধীনতার চেতনায় গড়ে ওঠা একটি স্বাধীনপ্রিয় দেশ। এই দেশের শক্তি শুধু অর্থনীতি, অবকাঠামো কিংবা উন্নয়নের পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ নয়; এর সবচেয়ে বড় শক্তি মানুষের পারিবারিক বন্ধন, সামাজিক মূল্যবোধ এবং পারস্পরিক আস্থা। অথচ সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সমাজে পারিবারিক সম্পর্কের উষ্ণতা যেন ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। এর প্রভাব শুধু একটি পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; এর অভিঘাত পড়ছে পুরো সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার উপর।
কথায় আছে, পরিবার থেকেই মানুষ প্রথম শিক্ষা নেয়। এখানেই একজন শিশু ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ, শৃঙ্খলা, সহমর্মিতা এবং নৈতিকতার শিক্ষা পায়। পরিবারে যদি স্নেহ, মায়া, মমতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে সেই শূন্যতা পূরণ করা সমাজ বা রাষ্ট্রের পক্ষে সহজ নয়। তাই একটি সুস্থ পরিবার মানেই একটি সুস্থ সমাজের ভিত্তি।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেখা গেছে, যেখানে পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হয়েছে, সেখানে একাকীত্ব, মানসিক অবসাদ, মাদকাসক্তি, পারিবারিক সহিংসতা এবং বিভিন্ন ধরনের অপরাধের প্রবণতা বেড়েছে। অবশ্য এসব সমস্যার পেছনে অর্থনৈতিক বৈষম্য, সামাজিক নীতি, শিক্ষা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবার প্রাপ্যতা এবং অন্যান্য বহু কারণও ভূমিকা রাখে। তবু পরিবার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষাবলয় হিসেবে কাজ করে—যেখানে মানুষ সংকটের সময়ে আশ্রয়, পরামর্শ ও মানসিক সমর্থন পায়।
বৈশ্বিক বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সূচক-২০২৪ অনুযায়ী, বাংলাদেশের মানুষের জীবনযাত্রার মানই দারিদ্র্যের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২২ সালের তথ্যমতে, বাংলাদেশের ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছেন। তাদের মধ্যে অতি দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছেন ৫ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ। এক্ষেত্রে সরকার দেশ উন্নয়নের জন্য গুরুত্ব দেওয়া বিষয়গুলোর পাশাপাশি পারিবারিক নীতি নৈতিকতার বিষয়ও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
কেননা আজকের বাংলাদেশ দ্রুত নগরায়ণ, প্রযুক্তিনির্ভর জীবন এবং ব্যস্ত কর্মসংস্কৃতির মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। এই পরিবর্তন অনেক ক্ষেত্রেই ইতিবাচক হলেও পরিবার থেকে অর্জন করা নীতি নৈতিকতা ও পারস্পরিক দায়িত্ববোধ যদি কমে যায়, তাহলে সামাজিক বন্ধন দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। ফলে আধুনিকতা ও উন্নয়নের পাশাপাশি বিচ্ছিন্নতারও কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই সরকারের মানবিক ও সামাজিক সংস্থাগুলো যেনো পারিবারিক ও সামাজিক মূ্ল্যবোধ নিয়ে জনগণকে সচেতন করে তাহলে রাষ্ট্র গঠণে আরও শক্তিশালী প্রজন্ম তৈরি হবে।
রাষ্ট্রের ভিত্তি কেবল ইট-পাথরের অট্টালিকা, সেতু, মহাসড়ক কিংবা সুউচ্চ ভবন নয়। একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত ভিত্তি হলো মানুষ, আর সেই মানুষ গড়ে উঠে পরিবারে। পরিবার যদি ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ ও নৈতিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ হয়, তাহলে সমাজে সহনশীলতা বাড়ে, অপরাধ কমে এবং নাগরিকদের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস দৃঢ় হয়। বিপরীতে পারিবারিক সম্পর্ক ভেঙে পড়লে সেই প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক স্থিতিশীলতার উপরও পড়তে পারে।
তাই উন্নয়নের আলোচনায় পারিবারিক মূল্যবোধকেও সরকার অতি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়তে শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়, প্রয়োজন মানবিক ও নৈতিক ভিত্তি। সেই ভিত্তির নাম পরিবার। কারণ পরিবারে যদি স্নেহ থাকে, সমাজে শান্তি থাকে; সমাজে শান্তি থাকলে রাষ্ট্রও হয় আরও স্থিতিশীল, মানবিক ও সমৃদ্ধ। তাই জাতীয় উন্নয়নের পাশাপাশি পারিবারিক বন্ধন রক্ষাও হওয়া উচিত আমাদের অন্যতম অগ্রাধিকার।
মাতৃভূমির খবর