প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬, ০৫:২০ পিএম
দেশের চলমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় শুধু রাজপথে কর্মসূচি ঘোষণা বা আন্দোলনের হুমকি না দিয়ে সংসদের মাধ্যমে কার্যকর বিকল্প পরিকল্পনা দেওয়ার জন্য বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।
তিনি বলেছেন, গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট কীভাবে মোকাবিলা করা যায়, জ্বালানি কোথা থেকে সংগ্রহ করা সম্ভব এবং জনগণের কাছে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ কীভাবে নিশ্চিত করা যায়—এসব বিষয়ে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট প্রস্তাব আসা প্রয়োজন। সরকারের সমালোচনার পাশাপাশি সংকট সমাধানে বাস্তবসম্মত পরামর্শ দেওয়াও রাজনৈতিক দায়িত্বের অংশ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
শুক্রবার রাজধানীর শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে বাংলাদেশ নৃত্যশিল্পী সংস্থার নবনির্বাচিত কার্যনির্বাহী কমিটির অভিষেক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় এসব কথা বলেন রিজভী।
বিরোধী দলগুলোর উদ্দেশে তিনি বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট নিয়ে কর্মসূচি দেওয়া কিংবা লংমার্চের ঘোষণা দেওয়ার অধিকার তাদের রয়েছে। তবে একই সঙ্গে সংকট থেকে উত্তরণের পথও দেখাতে হবে। কীভাবে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করা যায় এবং কোন পদক্ষেপ নিলে বর্তমান পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব, সে বিষয়ে বিকল্প পরিকল্পনা দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
রিজভী বলেন, জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের সদস্যদের সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করার পাশাপাশি জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে নিজেদের মতামত ও প্রস্তাব তুলে ধরার সুযোগ রয়েছে। সংসদের বাইরে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্বাভাবিক অংশ হলেও দেশের গুরুত্বপূর্ণ সংকট মোকাবিলায় গঠনমূলক পরামর্শ দেওয়াও জরুরি।
তিনি আরও বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিতভাবে অচলাবস্থা সৃষ্টি করা হলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়তে পারে। তাই আন্দোলন কিংবা কর্মসূচির মাধ্যমে পরিস্থিতি আরও জটিল করার পরিবর্তে কীভাবে সমস্যার সমাধান করা যায়, সেদিকে রাজনৈতিক দলগুলোর নজর দেওয়া উচিত।
রিজভীর মতে, দেশের জ্বালানি সংকটের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় সৃষ্ট অস্থিরতা অন্যতম। যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজার ও জ্বালানি পরিবহন ব্যবস্থায় যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহনে বাধা সৃষ্টি হওয়ায় জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দিয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। এর ফলে প্রয়োজনীয় জ্বালানি সংগ্রহ ও সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে বলে দাবি করেন বিএনপির এই নেতা।
তবে বর্তমান সংকটের পেছনে শুধু আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিই দায়ী নয়—অতীতে নেওয়া বিভিন্ন পরিকল্পনার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন রিজভী। তার ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে সমন্বয় না থাকলে ভবিষ্যতে একই ধরনের সংকট আবারও দেখা দিতে পারে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, অতীতের ভুল সিদ্ধান্তের পুনরাবৃত্তি করা হলে দেশের জ্বালানি পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। তাই বর্তমান সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্যও একটি টেকসই পরিকল্পনা প্রয়োজন।
রিজভী বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ শুধু শিল্পকারখানা বা ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়; সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনও এসব সেবার ওপর নির্ভরশীল। রান্না, শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা ও উৎপাদন—সব ক্ষেত্রেই নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ প্রয়োজন। তাই এ সংকট দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব সমাজের প্রায় সব শ্রেণির মানুষের ওপর পড়বে।
অনুষ্ঠানে জুলাইয়ের আন্দোলনে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন রিজভী। তিনি বলেন, সে সময় গান, নৃত্যসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিবেশনা আন্দোলনকারীদের মধ্যে উৎসাহ, সাহস ও উদ্দীপনা তৈরি করেছিল। সাংস্কৃতিক কর্মীদের ভূমিকা মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন তিনি।
বাংলাদেশ নৃত্যশিল্পী সংস্থার নবনির্বাচিত কার্যনির্বাহী কমিটির অভিষেক উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সংগঠনটির সভাপতি ফারহানা বেবী সভাপতিত্ব করেন। অনুষ্ঠানে সড়ক পরিবহন ও রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব, বিএনপির সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক আশরাফ উদ্দিন উজ্জ্বল, অভিনেতা হেলাল খান, জাকির হোসেন রুকনসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের নানা বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়। নতুন কমিটির সদস্যদের দায়িত্ব গ্রহণ এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে আরও গতিশীল করার বিষয়ে বক্তারা বক্তব্য দেন।
এদিকে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের মধ্যেই রিজভীর এই আহ্বান সামনে এসেছে। তার বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল—সংকট নিয়ে রাজনৈতিক কর্মসূচির পাশাপাশি বাস্তবসম্মত সমাধানের পথও তুলে ধরা। একই সঙ্গে তিনি মনে করেন, জাতীয় সংসদকে জনগুরুত্বপূর্ণ সমস্যা নিয়ে আলোচনা ও কার্যকর পরামর্শ দেওয়ার অন্যতম প্রধান জায়গা হিসেবে ব্যবহার করা উচিত।



