রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

এই রাজনৈতিক ব্যবস্থা বদলানো না হলে নতুন হাসিনা তৈরি হবে : মামুনুল হক

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬, ০৯:৪৩ পিএম

এই রাজনৈতিক ব্যবস্থা বদলানো না হলে নতুন হাসিনা তৈরি হবে : মামুনুল হক

ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেছেন, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক কাঠামোতে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা এক ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ার সুযোগ রয়েছে। এ ধরনের ব্যবস্থা বহাল থাকলে ভবিষ্যতে যে-ই ক্ষমতায় আসুক, দীর্ঘ সময় পর তিনিও স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে পারেন বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।

শুক্রবার সন্ধ্যায় নওগাঁ সদর উপজেলা পরিষদ হলরুমে আয়োজিত এক নাগরিক সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, তেল ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির প্রতিবাদে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নওগাঁ জেলা শাখা এ সমাবেশের আয়োজন করে।

মামুনুল হক বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর হাতে বিপুল ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত রয়েছে। এই কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার কাঠামো পরিবর্তন না করা হলে ভবিষ্যতে ক্ষমতায় যাওয়া ব্যক্তির মধ্যেও একই ধরনের ক্ষমতাকেন্দ্রিক মানসিকতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করা জরুরি।

তিনি বিএনপির বর্তমান নেতৃত্বের উদ্দেশে সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, তিনি এমন কোনো পরিস্থিতি দেখতে চান না, যেখানে ভবিষ্যতের সরকারও আগের সরকারের মতো পরিণতির দিকে এগিয়ে যাবে। তাঁর ভাষ্য, রাষ্ট্রের ক্ষমতা একটি ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত না রেখে বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে হবে।

জুলাই সনদের প্রসঙ্গ তুলে ধরে মামুনুল হক বলেন, বৈষম্যহীন ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর দাবি, প্রধানমন্ত্রীর হাতে থাকা কিছু ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির কাছে দেওয়ার মাধ্যমে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ভারসাম্য আরও শক্তিশালী করা যেতে পারে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপতির পদকে কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক ক্ষমতা দেওয়ার পক্ষেও মত দেন তিনি।

রাষ্ট্রপতির ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা করে তিনি বলেন, বর্তমানে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতা সীমিত। রাষ্ট্র পরিচালনায় রাষ্ট্রপতির হাতে কার্যকর কিছু দায়িত্ব ও ক্ষমতা থাকা প্রয়োজন। জুলাই সনদের মাধ্যমে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা বাস্তবায়নের দাবি জানান তিনি।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রসঙ্গেও বক্তব্য দেন খেলাফত মজলিসের আমির। তাঁর মতে, বিচার বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও নিয়োগের ক্ষেত্রে নির্বাহী বিভাগের প্রভাব কমানো প্রয়োজন। এ জন্য প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে একটি স্বাধীন বিচার বিভাগীয় কমিশনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম পরিচালনার প্রস্তাবের কথা তুলে ধরেন তিনি।

মামুনুল হক বলেন, বিচার বিভাগ স্বাধীন ও নিরপেক্ষ না হলে সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ বাধাগ্রস্ত হয়। কোনো রাজনৈতিক সরকার যাতে বিচার বিভাগকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে না পারে, সে জন্য সাংবিধানিকভাবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, অতীতে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলগুলো প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে দলীয় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছে। এর ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সমস্যার মুখে পড়েছে।

তিনি বলেন, পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, যোগ্যতা, দক্ষতা ও পেশাগত নিরপেক্ষতার ভিত্তিতে দায়িত্ব পালন করতে হবে। রাষ্ট্রের কর্মচারীরা কোনো দলের নয়, জনগণের সেবক—এই নীতিকে কার্যকর করতে হবে।

সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রেও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার দাবি জানান মামুনুল হক। তাঁর মতে, সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাব বন্ধ করতে একটি গ্রহণযোগ্য ও নিরপেক্ষ সরকারি কর্ম কমিশন প্রয়োজন। এতে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ নিশ্চিত হবে এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের সুযোগ পাবেন যোগ্য ব্যক্তিরা।

জুলাই আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, অনেক ত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে যে পরিবর্তনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা কোনোভাবেই আবার পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ফিরে যাওয়ার কারণে ব্যর্থ হতে দেওয়া যাবে না। একটি দলের প্রভাব থেকে বেরিয়ে আরেকটি দলের প্রভাব প্রতিষ্ঠা করাকে তিনি প্রকৃত পরিবর্তন হিসেবে দেখতে চান না।

মামুনুল হক আরও বলেন, রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে দলীয় আনুগত্যের পরিবর্তে সংবিধান, আইন ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ হতে হবে। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসন, পুলিশ কিংবা বিচার ব্যবস্থায় দলীয় আনুগত্যের পরিবর্তন হলে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার সম্ভব হবে না।

সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নওগাঁ জেলা শাখার সভাপতি মাওলানা ফজলুল হক শাহ। সঞ্চালনা করেন জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মুফতি ইসরাফিল আলম। এ সময় সংগঠনটির কেন্দ্রীয় মহাসচিব মাওলানা আতাউল্লাহ আমিন, কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আবুল হাসনাত জালালী, রাজশাহী মহানগরীর সভাপতি মাওলানা জোবায়ের হোসাইনসহ কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের নেতারা বক্তব্য দেন।

সমাবেশে বক্তারা গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার, প্রশাসনে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা এবং জনগণের ওপর অর্থনৈতিক চাপ কমানোর দাবি জানান।

মাতৃভূমির খবর

Advertisement
Advertisement
Link copied!